সাক্ষাৎকারে পুতিন: ভারত-চীনের নেতারা অত্যন্ত বিচক্ষণ, চাপের মুখে নতি স্বীকার করেন না মোদি

সাক্ষাৎকারে পুতিন: ভারত-চীনের নেতারা অত্যন্ত বিচক্ষণ, চাপের মুখে নতি স্বীকার করেন না মোদি
শেয়ার করুন

মস্কোর ঐতিহাসিক ক্রেমলিনের একাতেরিনা (ক্যাথরিন) হলে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া টুডে–র বিশ্ব এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক, ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা দুনিয়ার ভূমিকাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খোলামেলা মতামত দিয়েছেন।

দুই দিনের ভারত সফরের ঠিক আগে এই সাক্ষাৎকার রুশ প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ দিশা আরও স্পষ্ট করেছে।

পুতিন বলেন, “মোদি এমন একজন নেতা নন যিনি চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন। তিনি অত্যন্ত সৎ, নির্ভরযোগ্য একজন মানুষ। ভারত সত্যিই সৌভাগ্যবান—তিনি দেশের জন্য বাঁচেন, দেশের রক্ষক।”

রাশিয়া-ভারত সম্পর্কের মজবুত ভিত্তি নিয়ে তিনি বলেন, দুই দেশ কখনও তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নিজেদের সহযোগিতা ব্যবহার করেনি। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি—সব ক্ষেত্রেই সম্পর্ক “স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য”।

ভারত-চীন উত্তেজনার প্রসঙ্গে পুতিন বলেন, রাশিয়া কখনও দুই দেশের মধ্যে হস্তক্ষেপ করে না। তিনি বলেন, “ভারত ও চীন দু’দেশই আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মোদি ও শি—দুজনেই জ্ঞানী এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেতা।”

ব্রিকসের অভিন্ন মুদ্রা নিয়ে প্রশ্নে পুতিন স্পষ্ট জানান, এ ধরনের সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো উপযুক্ত নয়। ইউরোপের একক মুদ্রাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাশিয়া অন্তত এখনই কোনও নতুন ব্রিকস কারেন্সি চালুর পরিকল্পনা করছে না।

পাশ্চাত্য গণমাধ্যমের সমালোচনায় পুতিন বলেন, তারা ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ তাঁর বক্তব্য বিকৃত করে সোভিয়েত ইউনিয়ন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার মিথ্যা ইমেজ তৈরি করে। তাঁর কথায়, তারা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে আগ্রাসী মনোভাবকে正্যায়িত করতে চায়।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে তিনি বলেন, “যদি আমেরিকা রাশিয়ার পারমাণবিক জ্বালানি কিনতে পারে, তবে ভারত কেন পারবে না?”

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পুতিন আবারও দোষ চাপান পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর। তিনি দাবি করেন, ইউক্রেনে রুশভাষী মানুষের ওপর নির্যাতনের কারণেই রাশিয়াকে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, “ন্যাটো রাশিয়া ও ইউরোপ দুই দেশের জন্যই হুমকি।”

ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর মন্তব্য—দেশটি নিরপেক্ষ থাকা উচিত এবং রাশিয়া নিজের নিরাপত্তা রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলাস্কার বৈঠক প্রসঙ্গে পুতিন বলেন, ট্রাম্প “সত্যিই ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন”, যদিও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থও সেখানে জড়িত ছিল।

ভারতের উন্নয়নকে “প্রায় এক ধরনের বিস্ময়” বলে উল্লেখ করেন পুতিন। তিনি বলেন, “৭৭ বছর আগে ভারতের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩১ বছর। আজ তা প্রায় ৭০। শিশুমৃত্যু এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে—যা প্রমাণ করে যে উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা জীবন বদলে দিতে পারে।”

ভারতকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউরোপ যখন মন্দার মুখে, ভারত তখন এগিয়ে যাচ্ছে।

পুতিন বলেন, ভারতীয় সংস্কৃতি রাশিয়ার কাছে “রূপকথার মতো”, এবং এটি দুই দেশের মধ্যে ‘হৃদয় থেকে হৃদয়’-এর সম্পর্ক তৈরি করেছে। সোভিয়েত আমল থেকেই রাশিয়ায় ভারতীয় গান, সিনেমা এবং সংস্কৃতির জনপ্রিয়তা আজও অটুট।

গাজা সংকট নিয়ে পুতিন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং সমাধানে দ্রুততার প্রয়োজন নেই। তাঁর মত, শাসন কাঠামো এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে শেষ পর্যন্ত তা ফিলিস্তিনিদের হাতে হস্তান্তর করা যায়।

সিআইএ, মোসাদ ও রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শক্তিমত্তা নিয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, তথ্যপ্রকাশে সতর্ক থাকা জরুরি। তবে তিনি রাশিয়ার গোয়েন্দা ব্যবস্থার উন্নতিতে সন্তুষ্ট।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর ভাইরাল ‘অমরত্ব’ কথোপকথন নিয়ে পুতিন বলেন, মানবদেহের আয়ু বিজ্ঞান বাড়াতে পারে, কিন্তু প্রকৃত অমরত্ব অসম্ভব। তাঁর কথায়, “সবকিছুর শেষ আছে; শুধু ঈশ্বর চিরন্তন।”

Visited 9 times, 1 visit(s) today