বিডিআর হত্যাকাণ্ড: সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় ক্ষোভ ছিল ‘কেন আমাদের যুদ্ধ করতে দেওয়া হয়নি’

বিডিআর হত্যাকাণ্ড: সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় ক্ষোভ ছিল ‘কেন আমাদের যুদ্ধ করতে দেওয়া হয়নি’
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যার পর সেনাবাহিনীর অফিসারদের মধ্যে যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল, তার সবচেয়ে তীব্র প্রকাশ ঘটে ১লা মার্চ সেনাকুঞ্জে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে।

সেনা কর্মকর্তাদের একটাই প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে: “আমাদের ভাইদের চোখের সামনে জবাই করা হচ্ছিল, তখন কেন আমাদের যুদ্ধ করতে দেওয়া হলো না? কেন ট্যাঙ্ক নিয়ে পিলখানায় ঢুকে প্রতিশোধ নিতে দেওয়া হলো না?”

সেনাকুঞ্জের গোপন বৈঠকের ফাঁস হওয়া অডিও এবং সেদিন উপস্থিত সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, সেনা কর্মকর্তারা সরকারের ‘আলোচনা ও ক্ষমা’ নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন আরও বেশি রক্তপাতের জন্য।

সেই বৈঠকের অডিও

বৈঠকে একজন কর্মকর্তা ক্ষোভে কেঁদে ফেলে বলেন, “আমরা প্রস্তুত ছিলাম। ট্যাঙ্ক বের করে দিলেই ১৫ মিনিটে পিলখানা পরিষ্কার করতে পারতাম। কিন্তু আপনারা আলোচনা করলেন, ক্ষমা ঘোষণা করলেন। আমাদের অফিসারদের লাশ ফেলনায় ফেলে রাখা হলো, আর আমরা কিছুই করতে পারিনি। এটা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অপমান।”

আরেকজন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন কেন কোয়ার্টার গার্ডে গেলেন না? তিনি গেলে আরও অনেককে বাঁচানো যেত। আর যখন বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণ করল, তখন কেন আমাদের ঢুকতে দেওয়া হলো না? আমরা প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম।”

অডিও রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, একাধিক কর্মকর্তা একসঙ্গে চিৎকার করে বলছেন, “আমাদের হাত বাঁধা ছিল… আমরা যুদ্ধ করতে চেয়েছিলাম… আমাদের অফিসারদের রক্তের দাম কী?”

সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ নিজেও বৈঠকে স্বীকার করেন যে, বিডিআর জওয়ানদের অভিযোগগুলো ‘মিথ্যা ও প্ররোচিত’ ছিল, কিন্তু সরকারের নির্দেশে সেনাবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে বারবার বলেন, “আমরা আরও রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলাম। আলোচনা না করলে আরো হাজার হাজার জীবন হারাতে হতো।”

কিন্তু এই ব্যাখ্যা সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষোভ একটুও কমাতে পারেনি। বরং অনেকে মনে করেন, সরকারের এই ‘নরম নীতি’ সেনাবাহিনীকে অপমানিত ও অসহায় করে রেখেছিল।

পরদিন ২রা মার্চ নিহতদের রাষ্ট্রীয় জানাজায়ও এই ক্ষোভের ছায়া স্পষ্ট ছিল। সেনানিবাসে লক্ষাধিক মানুষের ভিড়ের মধ্যেও অনেক সেনা কর্মকর্তা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলতে শোনা গেছে: “আমরা যুদ্ধ করতে পারিনি বলেই আজ আমাদের এই লাঞ্ছনা।”

সেনাকুঞ্জের ওই বৈঠক এবং পরবর্তীতে ফাঁস হওয়া অডিও থেকে এটাই স্পষ্ট যে, বিডিআর হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে গভীর আঘাত ছিল শুধু সহকর্মীদের হারানো নয়, বরং তাদের প্রতিশোধ নিতেও দেওয়া হয়নি। এই ক্ষোভ আজও বাংলাদেশের সেনা-রাজনীতির সম্পর্কের এক কালো অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।

Visited 83 times, 1 visit(s) today