উগ্র ইসলামপন্থীদের উত্থানের পর এবার মূলধারার সমযোগ্যতায় যাচ্ছে কওমি শিক্ষা

উগ্র ইসলামপন্থীদের উত্থানের পর এবার মূলধারার সমযোগ্যতায় যাচ্ছে কওমি শিক্ষা
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে উগ্র ইসলামপন্থীদের দৃশ্যমান উত্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। জনসমর্থন, সাংগঠনিক প্রভাব ও মাঠপর্যায়ের উপস্থিতির কারণে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব এখন আগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান। ঠিক এমন প্রেক্ষাপটে কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে দেশের সাধারণ, কারিগরি ও আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার সমযোগ্যতায় আনার উদ্যোগ নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কওমি ধারাকে নিয়মিত মানদণ্ডের আওতায় আনা হলে শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় তদারকি আরও সুসংহত হবে।

সরকার কওমি মাদ্রাসাসহ দেশের সব ধরনের শিক্ষা ধারাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার উদ্দেশ্যে ‘বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামো নীতিমালা, ২০২৫’-এর একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ গত ১৬ই নভেম্বর নীতিমালাটি জনমত যাচাইয়ের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে যোগ্যতার সজ্ঞায়ন ও সমন্বয়, পূর্ব অর্জিত অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি, জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান প্রধান লক্ষ্য।

নীতিমালার সংজ্ঞায় উল্লেখ করা হয়, দেশে মাদ্রাসা শিক্ষা মূলত দুই ধারায় বিভক্ত—আলিয়া মাদ্রাসা, যা সরকার স্বীকৃত ও সাধারণ বিষয়ের সমন্বিত ধারা; এবং কওমি মাদ্রাসা, যা স্বতন্ত্র ধর্মীয় পাঠ্যক্রমভিত্তিক।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ) সামসুর রহমান খান বলেন, ‘কওমিকে মূল ধারায় নিয়ে আসতেই হবে। আগে মাস্টার্স (দাওরায়ে হাদিস) সমমান স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাঠামোগতভাবে নিচের স্তর থেকে সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করতে হবে। দেশে ও বিদেশে সনদ গ্রহণযোগ্য করতে হলে আলিয়া মাদ্রাসার মতো বাংলা-ইংরেজিসহ প্রয়োজনীয় বিষয় যুক্ত করতেই হবে।’

তিনি আরও বলেন, সরকারের এই অল্প সময়ে পুরো প্রক্রিয়া শেষ নাও হতে পারে, তবে পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার কওমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বিশেষত্ব বজায় রেখে মানোন্নয়ন করবে।

তিনি জানান, বাস্তবায়ন ম্যানুয়েল প্রস্তুত করা হচ্ছে—যেখানে গুণগতমান নিশ্চয়ন, কোন বিষয়ে কতটুকু পড়ানো হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে—এসব বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে।

সামসুর রহমান খান বলেন, নীতিমালার কমিটি ছাড়াও বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উচ্চশিক্ষায় ভূমিকা রাখবে। সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডগুলো নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করবে। বর্তমানে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বোর্ডের অধীনে থেকে এই কাঠামোয় যুক্ত থাকবে।

‘যারাই কাজ করুক, কমন ফ্রেমওয়ার্কে গুণগতমান নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে মূল স্রোতের বাইরে রাখা যাবে না,’ বলেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের আলোচনাও হয়েছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশে অনেক কওমি মাদ্রাসা আল-হাইআতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে পরিচালিত হয়। সবচেয়ে বড় বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক) ছাড়াও আরও পাঁচটি কওমি শিক্ষা বোর্ড রয়েছে।

প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামো’ (বিএনকিউএফ) নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়—সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার সব স্তরের যোগ্যতা, দক্ষতা ও সনদকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও পারস্পরিকভাবে সঙ্গতিপূর্ণ করতেই এ উদ্যোগ। দেশে দক্ষতা মূল্যায়নের কোনো একক কাঠামো না থাকায় কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যক্তি-যোগ্যতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মান ধরে শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে।

খসড়া কাঠামোয় জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে ১০টি স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ধারাবাহিক অগ্রগতি এবং শিক্ষা ধারাগুলোর মধ্যে স্থানান্তর (ভার্টিক্যাল ও হরাইজন্টাল) সহজ হবে। নীতিমালা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক মানসম্মত গুণগতমান নিশ্চয়নব্যবস্থা ও বাস্তবায়ন নির্দেশিকাও প্রণয়ন করা হয়েছে।

Visited 30 times, 1 visit(s) today