মার্কিন সিনেট ডেমোক্র্যাটিক সংখ্যালঘু নেতা চ্যাক শুমারকে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হচ্ছে, কারণ সাতজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর দলীয় অবস্থান থেকে সরে এসে রিপাবলিকানদের প্রস্তাবে ভোট দিয়েছেন, যা কোনো বড় ধরনের ছাড় ছাড়াই দীর্ঘ ৩৭ দিনের সরকারি অচলাবস্থা বা শাটডাউন সমাপ্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ শাটডাউন।
রিপাবলিকানদের নেতৃত্বে পাস হওয়া এই প্রস্তাবে সরকারি তহবিল ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত চালু থাকবে, তবে এতে ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’ (ACA)-এর আওতায় স্বাস্থ্যসেবা ভর্তুকি বাড়ানোর কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি, যা ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল। প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ আমেরিকান এই ভর্তুকির সুবিধা পান।
ডেমোক্র্যাট দলের প্রগতিশীল অংশ এই সিদ্ধান্তের জন্য সরাসরি শুমারকে দায়ী করছে। প্রতিনিধি রো খান্না সিবিএস নিউজকে বলেন, “তিনি সিনেটের নেতা। এই চুক্তি কখনোই সম্ভব হতো না যদি তিনি অনুমোদন না দিতেন। অন্য সিনেটররাও বলেছেন, পুরো আলোচনাজুড়ে শুমার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন।”
সোমবার সিনেটে গৃহীত বিলের পক্ষে ভোট দেওয়া ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ছিলেন ইলিনয়েসের ডিক ডারবিন, নিউ হ্যাম্পশায়ারের জিন শাহিন ও ম্যাগি হাসান, পেনসিলভানিয়ার জন ফেটারম্যান, নেভাডার ক্যাথরিন কর্টেজ মাস্টো ও জ্যাকি রোজেন এবং ভার্জিনিয়ার টিম কেইন। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত স্বতন্ত্র সিনেটর অ্যাংগাস কিংও প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।
রিপাবলিকানদের সিনেটে ৫৩টি আসন এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি আসন থাকলেও, কোনো বিল অগ্রসর করতে ৬০ ভোটের প্রয়োজন হয়। তাই ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ছাড়া এই প্রস্তাব পাস হওয়া সম্ভব ছিল না।
যদিও শুমার নিজে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেননি, দলীয় নেতারা অভিযোগ করছেন যে তিনি মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটদের রিপাবলিকানদের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে অনুমতি দিয়েছেন। সিনেটে ভাষণে শুমার বলেন, “আমেরিকান জনগণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিষ্ঠুরতা ও হৃদয়হীনতা ভুলবে না,” তবে তার এই বক্তব্যে দলের প্রগতিশীল অংশ সন্তুষ্ট নয়।
মিশিগানের সিনেটর এলিসা স্লটকিন বলেন, “নেতৃত্ব মানে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন ও অভিযোজনের ক্ষমতা। যদি আমরা তা না পারি, তবে আমরা ব্যর্থ হব।” প্রতিনিধি রো খান্না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ লেখেন, “শুমার আর কার্যকর নেতা নন, তাঁকে প্রতিস্থাপন করা উচিত।”
খান্না আরও অভিযোগ করেন, শুমার ইরাক যুদ্ধে ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর প্রতি অন্ধ সমর্থন দেখিয়েছেন, এখন আবার ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আপস করে দলকে বিপদে ফেলেছেন। তাঁর মতে, “দাতাদের খুশি রাখতেই অনেকে শুমারের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন না।”
নিউ ইয়র্কের প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ (এওসি) লিখেছেন, “ACA-র গড় সুবিধা প্রতি ব্যক্তি প্রতি মাসে ৫৫০ ডলার পর্যন্ত। এটি কেবল ভোটের কৌশল নয়, এটি মানুষের জীবনের প্রশ্ন। আমাদের এমন নেতা প্রয়োজন যাদের কথার মূল্য আছে।” মিশিগানের প্রতিনিধি রাশিদা তালিবও বলেন, “ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রয়োজন এমন নেতা যারা শ্রমজীবী মানুষের জন্য লড়াই করবে। শুমারকে পদত্যাগ করা উচিত।”
প্রগতিশীল কর্মী ও কংগ্রেসপ্রার্থী সাইকাত চক্রবর্তী মন্তব্য করেন, “৪০ দিন ধরে আমরা দৃঢ় ছিলাম, জনমত আমাদের পক্ষে ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নেতৃত্ব ট্রাম্পের কাছে আত্মসমর্পণ করল। শুমারসহ পুরো ডেমোক্র্যাটিক নেতৃত্বকে সরে দাঁড়াতে হবে।”
এদিকে, সদ্য নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাটিক সমাজতন্ত্রী জোহরান মামদানি এই পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য না করলেও, তাঁর জয় দলের প্রগতিশীল অংশকে নতুন উদ্দীপনা দিয়েছে। শুমারসহ অনেক শীর্ষ ডেমোক্র্যাট মামদানিকে সমর্থন করেননি।
তবে প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফরিস শুমারকে সমর্থন করে বলেন, “সাত সপ্তাহ ধরে নেতা শুমার ও সিনেট ডেমোক্র্যাটরা আমেরিকান জনগণের পক্ষে সাহসিকতার সঙ্গে লড়েছেন।”
এর আগে মার্চ মাসেও শুমার স্বাস্থ্য ভর্তুকি নিয়ে কোনো ছাড় না পেয়েই শাটডাউন এড়াতে রিপাবলিকানদের সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন, যা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল।
ডেমোক্র্যাটদের সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে সাফল্য সত্ত্বেও দলটির অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান বিভাজন এখন স্পষ্ট, যেখানে প্রগতিশীল ও বামঘেঁষা সদস্যরা শুমারের নেতৃত্ব নিয়ে ক্রমেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছেন।
সিনেট ডেমোক্র্যাটিক নেতাকে দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে অপসারণ করা যায়, যা ২০২৬ সালের নভেম্বর নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত হবে। তবে শুমারের সিনেট আসন ২০২৮ সাল পর্যন্ত নিরাপদ।
