মতামত || বাংলাদেশকে গ্রামীণের মতো এনজিও ভেবেই লামিয়া-নূরজাহানদের নিয়োগ দিয়েছেন ড. ইউনূস

মতামত || বাংলাদেশকে গ্রামীণের মতো এনজিও ভেবেই লামিয়া-নূরজাহানদের নিয়োগ দিয়েছেন ড. ইউনূস
শেয়ার করুন
অধ্যাপক ড. হাসান মাহমুদ টিপু

প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর ড. ইউনূস গত ১৪ মাসে ১৩ দেশে ১৪ বার বিদেশ সফর করেছেন এটা সবাই জানি। এর মধ্যে দুইবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিশাল বহর নিয়ে গিয়েছেন। এই দুইবার ছিল দরকারি রাষ্ট্রীয় সফর। এরপর থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিমসটেক সম্মেলনেও রাষ্ট্রীয় দরকারী সফর ছিল। বাকি ১১টা সফর, যথা- চায়না, কাতার, ভ্যাটিক্যান সিটি, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, আজারবাইজান, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান ও মালয়েশিয়া, ছিল অদরকারি বা অপশনাল, কিন্তু ৮৪ বছর বয়স্ক বৃদ্ধ মানুষ তার অসহায় অসুস্থ স্ত্রীকে রেখে দলেবলে ছুটে বেড়াচ্ছেন। একটা ব্যাপার মাথায় ঢুকে নাই আমার, আর তা হলো গত ৬০ বছর ধরে তিনি বিশ্বের প্রচুর দেশ ভ্রমণ করেছেন, তারপরও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ও তার স্ত্রীর প্রয়োজনে তার দেশে থাকার দরকার হলেও সরকারপ্রধান হয়ে অপ্রয়োজনীয় এতোগুলো সফরের দরকার হয়ে পড়লো কেন?

উনার প্রায় প্রতিটা সফরে যে একটা কাজ খুব গুরুত্ব দিয়ে করেছেন, সেটি হলো সামাজিক ব্যবসা, ক্ষুদ্রঋণ ও থ্রি জিরোর প্রচারণা। আরেকটা কাজ করেছেন, সেটি হলো গণ-অভ্যুত্থান বা আবু সাঈদকে বিক্রি করা। অভ্যুত্থানের সময় ঢাকার দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতির ছবি বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের উপহার দিয়ে সেসবের ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করেছেন। তার এই কার্যত “ব্যাক্তিগত দরকারী” সফরগুলোতে একজন ব্যাক্তি সবসময় ড. ইউনূসের পাশে বা সাথে ছিলেন, তার নাম লামিয়া মোরশেদ। লামিয়া ক্ষুদ্রঋণ এবং সামাজিক ব্যবসার ক্ষেত্রে তার কাজের জন্য পরিচিত। তিনি গত ৩১ বছর ধরে অর্থ্যাৎ ১৯৯৪ সাল থেকে গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্ট ও পরে ইউনূস সেন্টারের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন।

“কর্মরত আছেন” বলতে লামিয়া মোরশেদ এখনো ইউনূস সেন্টারের প্রধান বা এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। তিনি ইউনূস সেন্টারের পদ না ছেড়েই বাংলাদেশের সরকারের সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান যা সংবিধান পরিপন্থী। রাষ্ট্রের বেতনভুক্ত কর্মচারী হলে অন্য কোথাও চাকরি করা যাবে না, এমন বিধান আছে সংবিধানে। কিন্তু লামিয়া দুইটা লাভজনক জায়গায় একই সাথে কাজ করছেন। উপরন্তু, কানাডায় অবস্থানরত সাংবাদিক নাজমুস সাকিবের মতে, লামিয়া মোরশেদ কানাডার নাগরিক। অন্যদেশের নাগরিক হয়ে সরকারের সিনিয়র সচিব পদে নিয়োগ পাওয়াটাও সংবিধান পরিপন্থী।

লামিয়া মোরশেদের বাবা আলী কায়সার হাসান মোরশেদ ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত। লামিয়া লন্ডন স্কুল ও ইকোনোমিক্স থেকে স্নাতক করেছেন। অন্য একটা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে ১৯৯৪ সালে গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্টে যোগ দেন। এরপর থেকে গত ৩১ বছর ধরে সবচেয়ে ঘনিষ্ট সহযোগী হিসেবে ড. ইউনূস তথা গ্রামীণের সাথে আছেন।

ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর গ্রামীণ ব্যাংকের তথা তার ঘনিষ্ট ও পুরনো সহযোগী নূরজাহানকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে বসিয়েছেন। নুরজাহান বেগমকে তিনি পূর্ণ মন্ত্রীর পদে বসান। উনাকে যে মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বানানো হয়েছে সেই স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কাজে নূরজাহানের ন্যুনতম দক্ষতা নাই। তিনি ড. ইউনূসের সবচেয়ে পুরনো কর্মী।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, নূরজাহান বেগম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছেন। ১৯৭৬ সালে যখন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রকল্প শুরু হয় তখন নূরজাহান ড. ইউনূসের প্রথমসারির সহযোগীদের একজন ছিলেন। ব্যাংকের শুরুর দিকে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রথম ‘প্রিন্সিপাল’ ছিলেন। তিনি ২০১০ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন। এর আগে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি গ্রামীণ পরিবারের একটি অলাভজনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গ্রামীণ শিক্ষার ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরে দায়িত্ব পালন করছেন। নূরজাহান বেগমের পুরো চাকরি জীবন কেটেছে ড. ইউনূসের আজ্ঞাবহ হয়ে। নূরজাহান বেগমও গ্রামীণ শিক্ষার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন কিনা এরকম কোন তথ্য নাই।

সরকারের মন্ত্রী ও সিনিয়র সচিব হওয়ার জন্য নূরজাহান বেগম ও লামিয়া মোরশেদ যোগ্য কি যোগ্য না সেইটা মুখ্য বিষয় না। হয়তো যোগ্য। কিন্তু দুইজনকেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে বসানো হয়েছে ড. ইউনূসের ঘনিষ্ট সহযোগী হওয়ার কারণে। ড. ইউনূস যদি প্রধান উপদেষ্টা না হতেন তবে এই দুইজনেও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব পেতেন না। তার মানে কোটা বা স্বজনপ্রীতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ দেখিয়েছেন ড. ইউনূস এই দুইজনকে নিয়োগ দিয়ে। এ ছাড়াও তার নিজের ভাতিজা অপূর্ব জাহাঙ্গীরকে নিজের কার্যালয়ের অধীনে প্রেস টিমে জায়গা দিয়েছেন।

প্রথমে যে কোটাবিরোধী ও পরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করে একটা সরকার পতন ঘটানো হলো সেই আন্দোলনের মূল ভাষ্য ছিল সরকারী চাকুরিতে স্বজনপ্রীতি ও কোটা বিলোপ করা। যে কারণে ৮০০র উপরে মানুষের প্রাণ গেলো, সেই বৈষম্যই সবার আগে প্রকট করে তুলেছিলেন ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হয়ে। এটা আন্দোলনের মূল স্পিরিটের পরিপন্থী এবং প্রাণ দেওয়া প্রতিটা মানুষের সাথে ভন্ডামি।

কাজ করতে গেলে অনেক সময়ই নিজের পছন্দের মানুষকে আশেপাশে রাখতে চায়। উপদেষ্টা পরিষদের বেশ কয়েকজন আছেন যাদেরকে চুজ এন্ড পিক করেছেন ড. ইউনূস। সেটা মানা গেলেও তার নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে কাউকে চুজ এন্ড পিক করা চরম স্বজনপ্রীতির শামিল। উনি সমগ্র বাংলাদেশকে একটা এনজিও ভেবেছেন। গ্রামীণ ব্যাংক ও বাংলাদেশ তো এক বিষয় না, এটা উনি ভুলে গেছেন। ড. ইউনূসসহ এই মানুষগুলো আন্দোলনের সময় ও পরে আহত ও নিহত ছাত্র ও সাধারণ মানুষের জন্য কখনোই এক বাক্যও খরচ করেনি। কোনদিন দেশের স্বার্থে একটা বাক্য ব্যায়ও করেননি তিনি। গণতন্ত্র তো দূরের কথা! এছাড়াও সংবিধান ও দেশের প্রচলিত আইন অমান্যও করা হয়েছে এইসব নিয়োগের ক্ষেত্রে।

এসব লিখলাম কেন জানিনা। এসব বলেও কোন লাভ নাই জানি। কিন্তু এইয়াওব অপকর্মের একটা আর্কাইভ থাকুক। কোন একদিন এগুলো দলিল হিসেবে থাকবে। রেফারেন্স হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে।

লেখক পরিচিতি: অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, আইন বিভাগ, কারলেটন বিশ্ববিদ্যালয়

Visited 54 times, 1 visit(s) today