বিশেষ প্রতিবেদন
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘গ্রিন সিটি’—যা রাশিয়ান কর্মীদের জন্য নির্মিত আধুনিক আবাসিক এলাকা—এখন আর শুধুমাত্র একটি কাজের স্থান নয়, বরং একটি অদ্ভুত রহস্যময় জায়গায় পরিণত হয়েছে। গত ৮ বছরে এখানে কমপক্ষে ২৫ জন রাশিয়ান নাগরিকের মৃত্যু ঘটেছে, যার মধ্যে ২০২৫ সালেই চারটি ঘটনা।
হার্ট অ্যাটাক, আত্মহত্যা, ব্রেন স্ট্রোক—এই কারণগুলো সর্বিকভাবে দেখতে স্বাভাবিক, কিন্তু আরো গভীরে অনুসন্ধান করলে উঠে আসে মানসিক চাপ, পরিবেশগত অভিযোজনের অক্ষমতা এবং প্রকল্পের অন্ধকার দিকের ছায়া। এই মৃত্যুগুলো কি সত্যিই দুর্ঘটনা, নাকি উচ্চ চাপপূর্ণ পরিবেশের ফল? বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা অনুসন্ধান করেছি এই রহস্যের মূলে।
প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৭ সালে, রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থা রোসাটমের তত্ত্বাবধানে। এখানে প্রায় ৭,০০০ রাশিয়ান কর্মী কাজ করছেন—প্রকৌশলী, ইলেকট্রিশিয়ান, সহায়ক। বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক কেন্দ্র হিসেবে এটি দেশের বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানের প্রতীক, কিন্তু কর্মীদের জন্য এটি হয়ে উঠেছে একটি নীরব যুদ্ধক্ষেত্র। ২০২২ সালে এক সপ্তাহে ৫ জনের রসহ্যজনক মৃত্যু ঘটলে পুলিশ তদন্ত শুরু করে, কিন্তু ময়নাতদন্তে কোনো সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। এবার ২০২৫-এর ঘটনাগুলো নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
২০২৫-এর চারটি মৃত্যু: কী বলছে তথ্য?
৪ঠা জানুয়ারি: পাশাতারুক ক্সেনেলা (৪০), একজন রাশিয়ান কর্মী, গ্রিন সিটির একটি ২০ তলার ভবনের চতুর্থ তলা থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন। ঈশ্বরদী থানার ওসি শহিদুল ইসলাম বলেন, “স্বামীর সাথে ঝগড়া থেকে এমনটি ঘটতে পারে।” স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, কিন্তু ময়নাতদন্তে কোনো বাইরের হস্তক্ষেপের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
১০ই জানুয়ারি: ইভান কাইটমাজোভ (৪০), ইলেকট্রিক সার্কিট ইনস্টলার, গ্রিন সিটির ৯ম তলার ওয়াশরুমে ৫ দিন পর মৃত অবস্থায় পাওয়া যান। ঈশ্বরদী পুলিশের তদন্তকারী মনিরুল ইসলাম জানান, আত্মহত্যার সন্দেহ রয়েছে, কিন্তু কারণ অজানা।
২০শে সেপ্টেম্বর: কারপোভ ক্রিল (২৬ বা ২৮/৩০, বয়স নিয়ে সামান্য অমিল), ইলেকট্রিশিয়ান, জিগাতলা এলাকার ভাড়া বাসায় উপুড় হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া যান। পরিবারের ফোন না পাওয়ায় নিরাপত্তা প্রহরীরা দরজা ভেঙে প্রবেশ করে। রাশিয়ান চিকিৎসক মিখাইল তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত সুপার প্রণব কুমার সরকার বলেন, “প্রাথমিকভাবে ব্রেন স্ট্রোক বলে মনে হচ্ছে। কয়েকদিন আগে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন।” তবে পুলিশ ফাঁড়ির আফজাল হোসেনের মতে, ক্রিল দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। ময়নাতদন্ত চলছে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে।
এই ঘটনাগুলোর প্যাটার্ন স্পষ্ট: তরুণ থেকে মধ্যবয়সী কর্মী, একা থাকা, এবং হঠাৎ মৃত্যু। পূর্ববর্তী বছরগুলোতেও অনুরূপ—২০২২-এ সিঁড়ি থেকে পড়া, ঘুমের মধ্যে মৃত্যু; ২০২৩-এ শ্বাসকষ্ট। কোনোটাতেই কাজের স্থানে দুর্ঘটনা অন্য কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তবে একইসাথে এসব ঘটনার পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সুকৌশল হস্তক্ষেপকেও উড়িয়ে দিতে রাজি নয় একাধিক পক্ষ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে একটি ভূতুড়ে প্রজেক্টে পরিণত করার মাধ্যমে পশ্চিমা স্বার্থান্বেষী কোনো মহলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে কিনা- এমন সন্দেহ দানা বেঁধেছে।
কারণ অনুসন্ধান:
কাজের চাপে আটকে যাওয়া জীবন
এই মৃত্যুগুলোর পেছনে কী লুকিয়ে আছে? আমরা স্থানীয় পুলিশ রিপোর্ট, মিডিয়া প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দেখেছি:
১. মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট: ক্রিলের মতো অনেকে ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন। বিদেশে একা কাজ—পরিবার থেকে দূরে, ভাষা ও সংস্কৃতির বাধা—এটি মানসিক চাপ বাড়ায়। রাশিয়ায় সুইসাইড রেট বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ, এবং ইউক্রেন যুদ্ধের চাপে এটি আরও বেড়েছে। গ্লোবাল ডিফেন্স কর্পসের মতো রিপোর্টে উল্লেখ আছে, রাশিয়ান ব্যবসায়ীদের মধ্যে ‘রহস্যজনক’ মৃত্যু বেড়েছে, যা চাপ বা ফ্রডের সাথে যুক্ত হতে পারে। রূপপুরে এটি প্রকল্পের উচ্চমাত্রার চাপের পরিবেশের সাথে মিলে যায়।
২. শারীরিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি: হার্ট ফেইলিওর বা স্ট্রোকের মতো কারণগুলো দেখে মনে হয়, কর্মীরা বয়স্ক (৪০-৬০) এবং ক্লান্ত। বাংলাদেশের গরম, আর্দ্র আবহাওয়া রাশিয়ানদের জন্য অভ্যস্ত নয়। তদন্তে দেখা গেছে, কেউ কেউ মদ্যপান বা মাদক গ্রহণের অভ্যাসে জড়িত ছিলেন। ২০২২-এর তদন্তে একজনের হৃদরোগের সমস্যা এবং আরেকজনের মাদকাসক্তির বিষয় উঠে আসে।
৩. প্রকল্পের অন্ধকার ছায়া: রূপপুর নিরাপত্তা দিক থেকে নির্ভরযোগ্য, IAEA-এর ২০২৫-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “অপারেশনাল সেফটি কমিটেড।” কিন্তু দুর্নীতির কথিত অভিযোগ কর্মীদের মাঝে হতাশা সৃষ্টি করেছে। ACC-এর তদন্ত চলছে, রোসাটম এটাকে “অপপ্রচার” বলে খারিজ করেছে। এসব অস্থিরতা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। এছাড়া, প্রকল্পের বিলম্ব (প্রথম ইউনিট ২০২৫-এ চালু হওয়ার কথা) কর্মীদের কাজের দায় বাড়িয়েছে।
পুলিশের তদন্তগুলোতে কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কিন্তু স্থানীয় মিডিয়ায় উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” রোসাটম পুলিশের সাথে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য সাপোর্টের অভাব উল্লেখ করেনি।
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এবং কর্মীদের নিরাপত্তা
এই মৃত্যুগুলো রূপপুরের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটে এটি ১০% বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে, কিন্তু কর্মীদের জীবনের দাম কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পে মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম চালু করা দরকার—কাউন্সেলিং, ফ্যামিলি ভিজিটের সুবিধা। সরকার এবং রোসাটমকে যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে, যাতে শুধু ময়নাতদন্ত নয়, মূল কারণগুলো (চাপ, পরিবেশ) অনুসন্ধান হয়।
রূপপুর শুধু বিদ্যুৎ নয়, মানুষের গল্পও। এই মৃত্যুগুলোকে উপেক্ষা করলে, এটি আরেকটি ‘চেরনোবিল’ হয়ে উঠতে পারে—না পরমাণবিক দুর্ঘটনায়, বরং মানবিকতার অভাবে। কর্মীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন প্রয়োজন।
