বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের পথে যাবে?

বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের পথে যাবে?
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা, ২৯ আগস্ট ২০২৪: প্রখ্যাত ভারতীয় ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানির জাপান টাইমসে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চেলানি, যিনি নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ে বহু গ্রন্থের লেখক, তাঁর বিশ্লেষণে বাংলাদশের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে পাকিস্তানের অকার্যকর রাষ্ট্র ব্যবস্থার তুলনা করেছেন। তিনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন এবং সামরিক সমর্থনে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ইসলামপন্থী মৌলবাদের উত্থান দেশটিকে পাকিস্তানের মতো একটি অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

অস্থিরতার পটভূমি

গত ৮ আগস্ট সামরিক বাহিনীর সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই পরিবর্তনের পর দেশে ব্যাপক সহিংসতা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বিশ্বব্যাংক থেকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা থেকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার করে মোট ৬.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেলআউট তহবিলের জন্য আবেদন করেছে। এই আর্থিক সংকট দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গল্পকে ম্লান করে দিয়েছে, যা ২০২২ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।

ইসলামপন্থী উত্থান ও আইনশৃঙ্খলা

চেলানির নিবন্ধে বলা হয়, হাসিনার শাসনামলে যদিও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছিল, তিনি সামরিক বাহিনী এবং ইসলামপন্থী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর পতনের পর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো একটি সংকটময় রাষ্ট্রে পরিণত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। পাকিস্তানের মতো, যেখানে সামরিক বাহিনী জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে, বাংলাদেশেও সেনাবাহিনী এখন জাতীয় রাজনীতির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা জেনারেল এম. সাখাওয়াত হোসেনের বক্তব্যে এই প্রভাব স্পষ্ট হয়, যিনি রাজনৈতিক চাঁদাবাজি রোধে সেনাপ্রধানকে “পা ভাঙার” নির্দেশ দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল, যা পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার বিপরীতে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং অর্থনৈতিক মন্দা দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে। ব্যাপক জনতার সহিংসতা এবং সম্পত্তি ধ্বংসের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, সংখ্যালঘুদের উপর হামলা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ভারত, যিনি বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী, এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং শরণার্থী প্রবাহের আশঙ্কা করছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

চেলানি উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হাসিনার সরকারের পতনকে স্বাগত জানালেও, বাংলাদেশের অস্থিরতা এবং ইসলামপন্থী উত্থান তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যেতে পারে। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অন্তর্বর্তী সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে পদক্ষেপ নেওয়া। এছাড়া, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের সহায়তায় লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা ভারতের সিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, বিশেষ করে সামরিক প্রভাব, ইসলামপন্থী উত্থান এবং অর্থনৈতিক সংকট, পাকিস্তানের মতো একটি অকার্যকর রাষ্ট্রের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। জাতীয় পুনর্মিলন এবং স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে আন্তরিক প্রচেষ্টা ছাড়া দেশ আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে। ব্রহ্মা চেলানি সতর্ক করে দিয়েছেন, বাংলাদেশের এই অস্থিরতা কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।

Visited 20 times, 1 visit(s) today