উগ্রবাদীদের ভয়ে ৭০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম শাহপরান মাজারের শিরনি বিতরণ বন্ধের নির্দেশ প্রশাসনের

উগ্রবাদীদের ভয়ে ৭০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম শাহপরান মাজারের শিরনি বিতরণ বন্ধের নির্দেশ প্রশাসনের
শেয়ার করুন

❐ বিশেষ প্রতিবেদক

সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার শরীফ। প্রায় সাত শতাব্দী ধরে এখানে ওরস মাহফিল হয়ে আসছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। খতমে কোরআন, দোয়া, জিকির, মিলাদ, গিলাফ চড়ানো, গরু জবেহ, ফাতেহা পাঠ এবং আখেরি মোনাজাত শেষে শিরনি বিতরণ ছিল এ আয়োজনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু এ বছর প্রথমবারের মতো উগ্রবাদী মবের ভয়ে সেই শিরনি বিতরণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

মাজার কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রশাসনের নির্দেশেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে—শিরনি নিতে গিয়ে হুড়োহুড়ি ও মারামারির শঙ্কা রয়েছে। অথচ এত দীর্ঘ ৭০০ বছরের ইতিহাসে কখনো শিরনি বিতরণ নিয়ে বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি।

প্রশাসনের বক্তব্য ও নিরাপত্তার দাবি

ওরস উপলক্ষে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, তারা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। ওরসের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা, ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব-৯, অধিনায়ক, ৩৪ বীর, সিলেট জেলা স্টেডিয়াম আর্মি ক্যাম্প, সিলেট সিটি কর্পোরেশন, সিভিল সার্জন সিলেট, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সিলেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন সিলেট, ইমাম সমিতি সিলেট, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, অসামাজিক ও অনৈসলামিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য, হযরত শাহ্পরান (রহ.) সিলেট মাজার কমিটির সদস্য এবং হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের মোতাওয়াল্লি ও খাদেমসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্য ও প্রতিনিধিসহ সমন্বয়সভাও করেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ।

তবে নিরাপত্তার এমন আশ্বাসের মাঝেই প্রশাসন শিরনি বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। এতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে—যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, তবে কেন ঐতিহ্যবাহী শিরনি বিতরণে বাধা দেওয়া হলো?

নাগরিক সমাজের ক্ষোভ

ঐতিহ্য সংরক্ষণকর্মী ও নাগরিক সমাজ মনে করছে, প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত আসলে উগ্রবাদীদের কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছু নয়।

  • খাদেম আব্দুল আজিজ বলেন, প্রশাসনের সভায় বলা হয় শিরনি বিতরণে হুড়োহুড়ি হয় তাই এবার বন্ধ করতে। কিন্তু ৭০০ বছরে শিরনি বিতরণে কখনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। এখন দেশের পরিস্থিতি ভাল না, তাই নাকি এসব মানতে হবে। আমাদের কিছু করার নেই। তারা যা বলবে মেনে নিতে হবে।
  • পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের রেজাউল কিবরিয়া মন্তব্য করেন, অতীতে কখনো এখানে শিরনি বিতরণে বিঘ্ন ঘটেনি। অথচ প্রশাসন চোখ-কান বন্ধ করে উগ্রবাদীদের প্রভাব মেনে নিয়েছে। শিরনি বিতরণ শুধু ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও। এটিকে বন্ধ করা মানে ৭০০ বছরের ঐতিহ্য ধ্বংস করা।
  • সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহিন এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম শাহিন বলেন, শিরনি বিতরণ গরিব-অসহায়দের জন্য বড় আশীর্বাদ। নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রেখেও শিরনি বন্ধ করা প্রশাসনের ব্যর্থতা।
  • সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের আব্দুল হাই আল হাদী বলেন, শাহপরান মাজারে ওরস ৭০০ বছরের ঐতিহ্য। কখনো বিশৃঙ্খলার কথা শুনিনি। অথচ এবার বন্ধ হয়ে গেল। মাথা ব্যথায় মাথা কেটে ফেলার মতো সিদ্ধান্ত। মানুষের আবেগ ও মানতের সঙ্গে জড়িত শিরনি বন্ধ করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

প্রশাসনের নীরবতা

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. রেজাউল করিম ফোনে যোগাযোগে সাড়া দেননি। তবে আগে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে তিনি জানিয়েছিলেন, ওরস চলাকালে মাজারের পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখতে কঠোর নজরদারি থাকবে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, তার কাছে কেউ এ বিষয়ে আসেনি। হয়তো আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কীভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তিনি তা জানেন না।

ঐতিহ্যে ভাঙন, নিরাপত্তায় প্রশ্ন

করোনা মহামারির সময় ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় একবার শিরনি বিতরণ স্থগিত রাখা হয়। কিন্তু এবার উগ্রবাদীদের ভয়ে ৭০০ বছরের ঐতিহ্যে ভাঙন ঘটল। প্রশাসনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস থাকা সত্ত্বেও ঐতিহ্যগত একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আচার বন্ধ করে দেওয়া—রাষ্ট্রের দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।

সিলেটের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রশ্ন—শাহপরান মাজারের শিরনি কি সত্যিই নিরাপত্তাহীনতার কারণ, নাকি উগ্রবাদীদের চাপেই রাষ্ট্র পিছু হটছে?

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, গত বছরের ৫ই আগস্টের পর সারাদেশে অন্তত দেড় হাজার মাজার, খানকা শরীফ, দরগা, আধ্যাত্মিক স্থাপনা ও সমাধির ওপর যে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতা এবার শাহপরানের মাজারের ঐতিহ্যবাহী শিরনি বিতরণ বন্ধ করা। এটা নিঃসন্দেহে উগ্রবাদী জঙ্গিদের পায়ে রাষ্ট্রের মাথানত করার শামিল।

Visited 57 times, 1 visit(s) today