মতামত || যুক্তরাষ্ট্র থেকে অতিরিক্ত মূল্যে চীনা জাহাজ ক্রয়, কমিশন যাচ্ছে কার পকেটে?

মতামত || যুক্তরাষ্ট্র থেকে অতিরিক্ত মূল্যে চীনা জাহাজ ক্রয়, কমিশন যাচ্ছে কার পকেটে?
শেয়ার করুন

জামিল হাসান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৯৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপি কর্পোরেশনের (বিএসসি) জন্য দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ ক্রয় করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি নামক একটি প্রতিষ্ঠান এই জাহাজ সরবরাহ করবে। কিন্তু জাহাজ দুটি তৈরী হবে চীনের ডকইয়ার্ডে। আর এর ক্রয়মূল্য পরিশোধ করা হবে বিএসসির নিজস্ব তহবিল থেকে।

এখন একটু পেছনে ফেরা যাক।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বিএসসির বহরে জাহাজ ছিল মাত্র ৩টি। ২০১৭ সালে চীন থেকে ৬টি জাহাজ ক্রয়ের জন্য চুক্তি হয় এবং ৪টি জাহাজ বহরে যুক্ত হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে। জাহাজগুলি বহরে যুক্ত হওয়ার পর গত ৫/৬ বছরে লোকসানি প্রতিষ্ঠান বিএসসি লাভজনক অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএসসির তহবিলেও কিছু অর্থ জমা হয়েছে, রাষ্ট্র পেয়েছে বড় অঙ্কের রাজস্ব।

চুক্তির ৬টি জাহাজের মধ্যে ২টি বাল্ক ক্যারিয়ার ক্রয় তখনও বাকি। পরবর্তীতে এই দুটি বাল্ক ক্যারিয়ারের সাথে আরো ২টি অয়েল ট্যাংকারসহ মোট ৪টি জাহাজ ক্রয়ের জন্য জিটুজি ভিত্তিতে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল গত বছরের জুলাই -অগাস্টের দিকে।

চুক্তি মোতাবেক বাল্ক ক্যারিয়ারগুলো ৮০ হাজার টনের এবং অয়েল ট্যাংকারগুলো ১ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ ২৫ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার হওয়ার কথা ছিল। অয়েল ট্যাংকারগুলোর প্রতিটির মূল্য ৭৮০ কোটি ৮৪ লক্ষ টাকা এবং বাল্ক ক্যারিয়ার ৪৬২ কোটি ৬১ লক্ষ টাকা নির্ধারিত হয়। ২% সুদে ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে ২০ বছর ধরা হয় ঋণের মেয়াদ। চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণের চুক্তি চুড়ান্ত হলেই জাহাজ অর্ডার করার কথা ছিল। কিন্তু ৫ই আগস্ট জঙ্গি হামলার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা বেদখল হওয়ার পর চীনের সাথে এই চুক্তি করতে দেওয়া হয়নি।

উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে ক্ষমতা দখলকারী ইউনূস সরকারের সময় বিএসসির একাধিক জাহাজে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে কিংবা স্যাবোটাজ করা হয়। একটি জাহাজ সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয় এবং স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয় ন্যূনতম মূল্যে দখলদার সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি পক্ষের কাছে।

ফিরে আসি জাহাজ ক্রয়ের কথায়। জিটুজি চুক্তির আওতাধীন সেই বাল্ক ক্যারিয়ারই এখন কেনা হচ্ছে প্রতিটি ৪৬৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ অতিরিক্ত ৬ কোটি টাকায়। আবার ধারণ ক্ষমতা ৮০ হাজার টনের পরিবর্তে নেমে এসেছে ৬০ হাজার টনে। অর্থাৎ দুটি জাহাজের সর্বমোট ধারণ ক্ষমতা ৪০/৫০ হাজার টন কমে যাচ্ছে। এই ধারণ ক্ষমতা পূরণ করার জন্য অতিরিক্ত আরও একটি জাহাজ সংযুক্ত করতে হবে বহরে।

চীন থেকে সরাসরি জাহাজ ক্রয় করা হলে অনেক কম খরচেই পাওয়া যেত। কিন্তু এখন মার্কিন কোম্পানির মাধ্যমে বেশি দামে কেনা হচ্ছে এসব জাহাজ। এক্সিম ব্যাংকের ঋণের মাধ্যমে যদি কেনা হত তাহলে বিএসসি জাহাজ চালিয়ে আয় করে মূল্য পরিশোধ করতে পারত। আগের জাহাজগুলির মূল্য এইভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে। ফলে নিজস্ব তহবিলে হাত দিতে হত না বিএসসিকে।

এখন ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করে টেন্ডার করতে গেলে ৫/৬ মাস সময় লাগবে। ততদিন এই সরকারের মেয়াদ থাকবে কিনা কেউ জানে না। নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য এই প্রকল্প মুলতুবী রেখে গেলে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচের অবারিত সুযোগ রয়ে যাচ্ছে। কমিশনের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সমস্যা থাকবে না! এত টাকার লোভ কি সামলানো যায়? এটাই নয়া বন্দোবস্ত এই লাল সরকারের। লুটেপুটে নাও যা পাও।

পরিচিতি: রাজনীতি বিশ্লেষক

Visited 36 times, 1 visit(s) today