আন্তর্জাতিক
গাজায় তীব্র মানবিক সংকট ও ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পরিকল্পনার প্রেক্ষিতে জার্মানি ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছে—যা ঐতিহাসিকভাবে বার্লিনের জন্য এক স্পর্শকাতর পদক্ষেপ এবং ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষের প্রতিফলন।
রক্ষণশীল চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস, যিনি এতদিন ইসরায়েলের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে পরিচিত ছিলেন, শুক্রবার ঘোষণা দেন যে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ ঘোষিত লক্ষ্য—হামাস নির্মূল ও জিম্মি মুক্তি—পূরণ করতে পারছে না।
এটি মের্ৎসের জন্য সাহসী পদক্ষেপ, কারণ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সত্ত্বেও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে জার্মানিতে আমন্ত্রণ জানানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন।
জার্মানির দীর্ঘদিনের “যা-ই হোক” ধাঁচের ইসরায়েল সমর্থন—যা নাৎসি হলোকাস্টের ঐতিহাসিক অপরাধবোধে প্রোথিত—এখন অভূতপূর্বভাবে পরীক্ষার মুখে। গাজায় বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা, ধ্বংসস্তূপ, ও অনাহারে কাতর শিশুদের দৃশ্য কয়েক দশকের নীতিকে চ্যালেঞ্জ করছে।
জার্মানির এই পদক্ষেপ মূলত সেই অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করবে, যা গাজায় অভিযানে ব্যবহৃত হতে পারে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬৬% জার্মান নাগরিক চান সরকার ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়াক, যা ২০২৪ সালের এপ্রিলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
এদিকে, সরকারের অভ্যন্তরে ভিন্নমতও স্পষ্ট হচ্ছে। মের্ৎসের জোটসঙ্গী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা (এসপিডি) শুধু অস্ত্র রপ্তানি নয়, বরং ইইউ চুক্তি স্থগিত ও আহত শিশুদের বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার মতো পদক্ষেপের দাবিও জানাচ্ছে।
গণমাধ্যমেও বিভাজন স্পষ্ট—ডের শ্পিগেল ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করে কভার স্টোরি করেছে, আর বিল্ড পত্রিকা হামাসের নৃশংসতা ও ক্রমবর্ধমান ইসরায়েলবিরোধী মনোভাবের দিকে আঙুল তুলেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের স্থল ও বিমান হামলায় ৬০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১,২০০ জন নিহত ও ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানির এই সতর্ক অবস্থানের পেছনে শুধু নাৎসি অতীত নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কও একটি বড় কারণ। জার্মানি বর্তমানে ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র ক্রেতা, আর সম্প্রতি ২৬০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তিও হয়েছে।
তবে সমালোচকরা সতর্ক করেছেন, যদি ইসরায়েল পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে জার্মানিতে অস্ত্র সরবরাহ সীমিত করে, তবে জার্মানির ভবিষ্যৎ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
