আর্মেনিয়া-আজারবাইজান ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি: নাগোর্নো-কারাবাখ সংঘাতের অবসান, ট্রাম্প রুটের সূচনা

আর্মেনিয়া-আজারবাইজান ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি: নাগোর্নো-কারাবাখ সংঘাতের অবসান, ট্রাম্প রুটের সূচনা
শেয়ার করুন
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি। ওয়াশিংটন ডিসি, ৯ আগস্ট ২০২৫ :

দশকের পর দশক ধরে চলা নাগোর্নো-কারাবাখ সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান এক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গত ৮ আগস্ট হোয়াইট হাউসে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান এবং আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চুক্তির মূল বিষয়

চুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে ‘ট্রাম্প রুট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি’ নামে একটি ২০ মাইল দীর্ঘ ট্রানজিট করিডর, যা আজারবাইজানের মূল ভূখণ্ডকে তার নাখচিভান স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সঙ্গে আর্মেনিয়ার ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে সংযুক্ত করবে। এই করিডরে রেল, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন, ফাইবার অপটিক লাইন এবং সম্ভাব্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই করিডরের উন্নয়নের জন্য ৯৯ বছরের একচেটিয়া অধিকার দেওয়া হয়েছে, যা একটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম দ্বারা পরিচালিত হবে। এই করিডর আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি রপ্তানির সুযোগ বাড়াবে।

চুক্তিতে দুই দেশ একে অপরের সীমানা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানানো, সামরিক সংঘাত বন্ধ করা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া, চুক্তির মাধ্যমে ওএসসিই’র মিনস্ক গ্রুপ বিলুপ্ত করার জন্য যৌথ আবেদন করা হয়েছে, যা এতদিন এই সংঘাতের মধ্যস্থতার দায়িত্ব পালন করছিল।

সংঘাতের পটভূমি

১৯৮৮ সালে নাগোর্নো-কারাবাখ, আজারবাইজানের একটি পার্বত্য অঞ্চল যেখানে প্রধানত আর্মেনীয় জাতিগোষ্ঠীর বাস, আর্মেনিয়ার সমর্থনে আজারবাইজান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে দুটি যুদ্ধ এবং অসংখ্য সংঘর্ষে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। ২০২৩ সালে আজারবাইজানের একটি দ্রুত সামরিক অভিযানে নাগোর্নো-কারাবাখ সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার হয়, যার ফলে প্রায় ১ লাখ আর্মেনীয় বাসিন্দা আর্মেনিয়ায় পালিয়ে যায়। এই চুক্তি দীর্ঘদিনের এই শত্রুতার অবসান ঘটিয়েছে।

আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ বলেন, “আমরা আজ দক্ষিণ ককেশাসে শান্তি প্রতিষ্ঠা করছি এবং আমাদের জনগণের মধ্যে বাস্তব সংযোগ স্থাপন করছি।” আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান এই চুক্তিকে “শান্তির একটি নতুন অধ্যায়” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “এটি আমাদের দেশ ও অঞ্চলের জন্য একটি সাফল্য।” উভয় নেতাই ট্রাম্পের মধ্যস্থতার প্রশংসা করে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব

এই চুক্তি রাশিয়ার আঞ্চলিক প্রভাবকে কমিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে শক্তিশালী করেছে। দক্ষিণ ককেশাসে রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করলেও, ইউক্রেন যুদ্ধে তার ব্যস্ততা এই অঞ্চলে তার প্রভাব হ্রাস করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই করিডর ইরান ও রাশিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়ে তুরস্ক ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে আজারবাইজানের সংযোগ স্থাপন করবে, যা ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত সম্পৃক্ততার উপর। অতীতে বহুবার শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে, এবং আর্মেনিয়ার সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে আজারবাইজানের দাবি এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। তবে, এই চুক্তি অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্মোচন এবং শান্তির ভিত্তি স্থাপনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের এই শান্তি চুক্তি দক্ষিণ ককেশাসে শান্তি ও সমৃদ্ধির একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তি কেবল দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতিই নয়, বরং অঞ্চলটিকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

Visited 14 times, 1 visit(s) today