আমিনুল হক পলাশ
গত ৩১শে জুলাই, হোয়াইট হাউজ বাংলাদেশ থেকে আমদানীকৃত পণ্যের উপর যুক্তরাষ্ট্রের রিসিপ্রোকাল ট্যারিফের পরিমাণ ২০ শতাংশ পুনঃনির্ধারণ করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ নীতির অংশ হিসেবে গত ৩রা এপ্রিল বিশ্বের যেসব দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি আছে তাদের উপর ট্যারিফ আরোপ করা হয়। বাংলাদেশের উপর ধার্য্য হয় ৩৭% রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ। সেই থেকে গত চার মাস বেশ কয়েক দফায় মার্কিন কর্তৃপক্ষের সাথে অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধিদের বৈঠক ও দেন দরবার চালার পর ২০ শতাংশে তা পুনঃনির্ধারিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী বাংলাদেশকে নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টের মোড়কে করতে হয়েছে গোপনীয় চুক্তি, দিতে হয়েছে ২৫টি বোয়িং বিমানসহ দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানী, গম ও তুলা আমদানীর প্রতিশ্রুতি।
নতুন এই ২০ শতাংশ রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্য রপ্তানিতে এখন থেকে ৩৫% (পূর্বের গড় ১৫ শতাংশ) শুল্ক দিতে হবে। অর্থাৎ এনডিএ স্বাক্ষর কিংবা বিপুল পরিমাণ অপ্রয়োজনীয় আমদানীর প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কের মুল পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের কর্তাব্যক্তিগণ ১৫ শতাংশ ট্যারিফ কমানোকে বিশাল কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে প্রচার করলেও পরিসংখ্যান বলছে ১৫ শতাংশ ট্যাক্স কমানোর পরেও যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের মূল রপ্তানি পণ্য, তৈরি পোশাকের উপর কার্যকর শুল্কের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৩৬.৫% যা আমাদের প্রতিদ্বন্দী দেশসমূহের চেয়েও বেশি।
আজকের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ না। এই বিষয়টি ইতোমধ্যেই বহুল আলোচিত। উপরন্তু যেহেতু রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ অন্যান্য দেশের উপরেও আরোপিত হয়েছে, তাই সেটির অর্থনৈতিক প্রভাব বাণিজ্যিকভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব ছিলো। কিন্তু শুধুমাত্র ১৫ শতাংশ ট্যারিফ কমানোর জন্য জনগণকে অন্ধকারে রেখে যে এনডিএ স্বাক্ষর করা হয়েছে সেটিই বরং মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিৎ। দুঃখজনক হলেও সত্য যেসকল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল বুদ্ধিজীবী কিংবা অর্থনীতিবিদরা একসময় সকাল-সন্ধ্যা নিয়ম করে দেশবিক্রির অভিযোগ তুলতেন, মিটিং মিছিল করে রাজপথ উত্তপ্ত করতে তাদের কাউকেই এটা নিয়ে আওয়াজ তুলতে দেখা যাচ্ছে না।
ট্যারিফ কমানোর শর্ত হিসেবে ২৫টি বোয়িং বিমান ক্রয় কিংবা গম ও তুলা ক্রয়ের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি গণমাধ্যমে লিখালিখি হয়েছে। কিন্ত অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন ২ রা জুলাই গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজেই বলেছেন ট্যারিফ নিয়ে আলোচনার সময় মার্কিন কর্তৃপক্ষকে ২৫টি বোয়িং বিমান ক্রয় নিয়ে সিরিয়াস মনে হয়নি, বরং মার্কিন কর্তৃপক্ষ নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়টিই সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়েছেন!
অর্থাৎ এটি প্রতীয়মান,বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যে এনডিএ স্বাক্ষর করেছে তাতে বাণিজ্যিক বিষয়ের চেয়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ই সন্নিবেশিত হয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়কে প্রাধান্য দিবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ কি রক্ষিত হয়েছে? উত্তর হচ্ছে, না। বরং আক্ষরিক অর্থেই একটি গোলামী চুক্তির মাধ্যমে দেশে সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহনের সক্ষমতা এবং নিরপেক্ষ কূটনৈতিক অবস্থানকে ধ্বংস করা হয়েছে এই চুক্তির মাধ্যমে।
চলুন জানার চেষ্টা করি, কী আছে এই নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টে। স্বভাবতই বাংলাদেশ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কোন পক্ষই এই চুক্তি জনসম্মুখে প্রকাশ করেনি, তথাপি বিভিন্ন সূত্র থেকে এই চুক্তির বিভিন্ন বিষয় ইতোমধ্যে জানা গিয়েছে। আশংকার বিষয় হলো আদতে ট্রেড ডেফিসিট কমানোর লক্ষ্যে আলোচনার কথা বলা হলেও বাংলাদেশের সবগুলো সম্ভাবনাময় এবং গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে এই এনডিএতে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহনের বিষয়ে অনেকাংশেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদাহরণ নিচে উল্লেখ করা হল।
চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চীন থেকে বাংলাদেশের সামরিক ক্রয় হ্রাস করতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয় বৃদ্ধি করতে হবে। অফিসিয়ালি শুধুমাত্র চীন থেকে সামরিক ক্রয় হ্রাসের কথা বলা হলেও চীনের পাশাপাশি রাশিয়া এবং ইরান থেকেও যে কোন ধরনের সামরিক ক্রয়ের বিষয়ে কঠোর আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীত সামরিক সরঞ্জাম এবং যুদ্ধাস্ত্রের শতকরা ৯০ শতাংশই চীন থেকে এবং বিমানবাহিনীর শতকরা ৮০ শতাংশ চীন এবং রাশিয়ার থেকে আমদানিকৃত।
অর্থাৎ আমাদের পুরো সামরিক সক্ষমতা এই দুটি দেশের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। এখন চুক্তি অনুযায়ী যদি এই দুই দেশ থেকে সামরিক ক্রয় সীমিত কিংবা বন্ধ করা হয়, তাহলে সন্দেহাতীতভাবেই দেশ দুটিও আমাদের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করবে, যা আমাদের সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করবে।
পোশাক শিল্পের পাশাপাশি বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রমবর্ধমান রপ্তানী পণ্য হচ্ছে ঔষধ শিল্প। বাংলাদেশে উৎপাদিত ঔষধ বিশ্বের প্রায় ১৫০ টি দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। এই ঔষধ শিল্পের দিকেও নজর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তিতে বাংলাদেশকে ঔষধ এবং মেডিক্যাল ডিভাইস সংক্রান্ত এফডিএ (ফুড এবং ড্রাগ এডমিনিস্ট্রশনে) সার্টিফিকেশন বিনা বাঁধায় মেনে নিতে বলা হয়েছে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত সকল ধরনের ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য এবং ডিভাইস বাংলাদেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ডিজিডিএ অথোরিটির পূর্বানুমতিসহ সকল অশুল্ক বাধা দূর করার শর্ত দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত বাংলাদেশে ঔষধ শিল্প এবং মেডিকেল ডিভাইসের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র একক আধিপত্য বিস্তারে পথ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের আরেকটি উঠতি সম্ভাবনাময় খাত হলো জাহাজ নির্মাণ শিল্প খাত। ধীরে ধীরে বেড়ে উঠা এই শিল্পের বাজার ইতোমধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইতোমধ্যে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশে উৎপাদিত জাহাজ। সেই জাহাজ শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের মানদন্ড অনুসরণের শর্ত আরোপ করা হয়েছে এনডিএ-তে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র জাহাজ শিল্পের কোন মেজর স্টেকহোল্ডার না। মূলত ১৯৭৫ সালের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ভাটা পড়েছে। চীনের একটি সাধারণ শিপইয়ার্ডে প্রতিবছর যে পরিমাণ জাহাজ তৈরি করা হয়, পুরো যুক্তরাষ্ট্রে সেই পরিমাণ জাহাজ তৈরি হয় না। এই খাতে চীনের পর রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের অবস্থান। বাংলাদেশের জাহাজ নির্মান শিল্পের কারিগরি সহায়তাও এই তিনটি দেশ থেকেই আসে। যুক্তরাষ্ট্রের মানদন্ড অনুসরণের শর্ত আরোপের মাধ্যমে মূলত এই শিল্পকে অংকুরেই ধ্বংস করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সাথে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে বন্দর, জেটি এবং জাহাজে চীনের তৈরি লিজিস্টিকস সিস্টেম লগিংক ব্যবহারের উপর।
বাদ যায়নি বাংলাদেশের কৃষিখাতও। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে কৃষিখাত সংক্রান্ত মার্কিন বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সনদ বাংলাদেশকে বিনা বাক্যে মেনে নেয়ার শর্ত দেয়া হয়েছে। উপরন্তু বাংলাদেশের ডেইরি খাতকে মার্কিন মানদন্ডে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। কোন ধরনের পূর্বানুমতি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত যেকোন কৃষিপণ্য বাংলাদেশে আমদানির সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। মেনে নিতে বলা হয়েছে মার্কিন যেকোন সংস্থার দেয়া হালাল সনদও। অর্থাৎ একদিকে বাংলাদেশী কৃষিপণ্যের উপর মার্কিন মানদন্ড চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, অন্যদিকে বিনাবাধায় বাংলাদেশে মার্কিণ কৃষিপণ্য বাজার তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন।
এনডিএ এর অন্যতম ভয়ংকর দিক হচ্ছে শ্রমিক অধিকার রক্ষার অজুহাতে আরোপিত শর্তসমূহ। মাত্র ২০ শতাংশ শ্রমিকের সম্মতিতে যেকোন কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন/সংগঠন করার সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে। এমনকি ইপিজেডসমূহেও ট্রেড ইউনিয়ন তৈরির নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনের নিবন্ধন সহজ করার শর্ত দেয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে আবেদন করা সকল শ্রমিক সংগঠনের আবেদনের নিষ্পত্তি দ্রুততম সময়ে করতে বলা হয়েছে। একইসাথে শ্রম পরিদর্শকদের সংখ্যা এবং ক্ষমতাবৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য কারখানা মালিকদের জরিমানা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এর পরিণতি কি হতে যাচ্ছে তা বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সহ অন্যান্য সকল শিল্পের মালিকরা অচিরেই বুঝতে পারবেন।
এখানে শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ন কিছু বিষয় উল্লেখ করা হলো। এর বাইরেও মেধাস্বত্ব, পরিবেশ, বিনিয়োগ, সেবাখাত ইত্যাদি প্রায় সকল ইস্যুতে যে ধরনের শর্ত দেয়া হয়েছে তার প্রতিটিই বাংলাদেশের স্বার্থপরিপন্থী কিংবা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অনুপোযগী। এই এনডিএতে আক্ষরিক অর্থেই যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব কোন অঙ্গরাজ্যে যেসকল নিয়ম নীতি অনুসরণ করে তার অনেক কিছুই বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় প্রতিটি খাতকে টার্গেট করে সেখানে দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্যই এই শর্তগুলো দেয়া হয়েছে। এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে কেবলমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলই করবে না, বরং আমাদের ঐতিহাসিকভাবে রক্ষা করে আসা আমাদের নিরপেক্ষ কূটনৈতিক অবস্থানকে ধ্বংস করবে। এই চুক্তিকে তাই দেশবিক্রির চুক্তি বললেও অত্যুক্তি হবে না। অথচ আফসোস, দেশদ্রোহী ইউনূস গং জনগণ জানতেও দিলো না তাদের কি সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে!
পরিচিতি: সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
