মৃণ্ময় সেন
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়, যেখানে অগণিত তরুণ তাদের জীবনের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, আর ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দিয়ে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন। এই তরুণদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন শাফী ইমাম রুমি, যিনি শহিদ জননী জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের ক্র্যাক প্লাটুনের একজন দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা। রুমির জীবন, ত্যাগ, ও দেশপ্রেমের গল্প আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। তাঁর জীবনের কাহিনী যুবক ও তরুণদের কাছে শুধু একটি গল্প নয়, বরং একটি জীবন্ত দীক্ষা—দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার শিক্ষা।
রুমির শৈশব ও শিক্ষা: এক প্রতিভাবান তরুণের উত্থান
১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ ঢাকায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শাফী ইমাম রুমি। তাঁর বাবা শরীফ ইমাম ছিলেন একজন প্রকৌশলী, আর মা জাহানারা ইমাম ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ ও লেখিকা। রুমির নামকরণ করা হয়েছিল মহাকবি জালালুদ্দিন রুমির নামে, এই আশায় যে তিনি একদিন জ্ঞানী ও দার্শনিক হবেন। শৈশব থেকেই রুমি ছিলেন বইয়ের পোকা, মেধাবী, এবং স্পষ্টভাষী। তিনি আজিমপুরের একটি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষা শুরু করেন এবং পরে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি পাকিস্তান শিক্ষা বোর্ডে ম্যাট্রিকুলেশনে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। ১৯৭১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি আমেরিকার ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে (আইআইটি) পড়ার সুযোগ পান। কিন্তু দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের স্বপ্নকে ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই সিদ্ধান্তই রুমিকে একজন সাধারণ তরুণ থেকে অসাধারণ বীরে রূপান্তরিত করে।
মুক্তিযুদ্ধে রুমির পথচলা: ক্র্যাক প্লাটুনের বীরত্ব
১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম দমন-পীড়ন শুরু হলে রুমির মনে দেশপ্রেমের আগুন জ্বলে ওঠে। তিনি তাঁর মা-বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য। ১৯ এপ্রিল তিনি মা জাহানারা ইমামকে রাজি করান এবং ২ মে সীমান্ত পার হওয়ার প্রথম চেষ্টা করেন, যদিও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাঁকে ফিরে আসতে হয়। দ্বিতীয় চেষ্টায় তিনি সফল হন এবং ভারতের মেলাঘরে সেক্টর-২ এর অধীনে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই সেক্টরটি পরিচালনা করছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ এবং এটিএম হায়দার। প্রশিক্ষণ শেষে রুমি ঢাকায় ফিরে ক্র্যাক প্লাটুনে যোগ দেন, যে দলটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঢাকার বুকে দুঃসাহসিক গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করেছিল।
ক্র্যাক প্লাটুন ছিল একটি কিংবদন্তি গেরিলা দল, যারা “হিট অ্যান্ড রান” কৌশলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল। রুমি এই দলের একজন নির্ভীক সদস্য ছিলেন। তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন, গ্যানিজ পেট্রোল পাম্প, উলন পাওয়ার স্টেশন, যাত্রাবাড়ী পাওয়ার স্টেশন, এবং ধানমণ্ডি রোডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে অংশ নেন। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ২৫ আগস্ট ধানমণ্ডি রোডে পরিচালিত অপারেশনটি ছিল অসাধারণ। এই অপারেশনে রুমি ও তাঁর সঙ্গীদের হাতে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। পালানোর সময় পাকিস্তানি সেনার একটি জিপ তাঁদের পিছু নিলে রুমি স্টেনগানের বাঁট দিয়ে গাড়ির পেছনের কাঁচ ভেঙে ফায়ার করেন, যার ফলে জিপটি উল্টে যায় এবং তাঁর দলের সবাই প্রাণে বেঁচে যায়। এই ঘটনা রুমির অসীম সাহস ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতার প্রমাণ বহন করে। তাঁর সহযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীর প্রতীক বলেছিলেন,
“একজন মুক্তিযোদ্ধা কতগুলো অ্যাকশন করেছে, সেটা বড় কথা নয়। যদি একটি অ্যাকশনে সে সাহস ও বীরত্ব দিয়ে সফল হতে পারে, সেটাই বড় কথা। রুমি ঢাকার অ্যাকশনে অনেক বেশি সাহসের পরিচয় দিয়েছিল।”
শহিদ রুমির আত্মত্যাগ
১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট রাতে রুমি তাঁর নিজ বাড়িতে ছিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গোপন সূত্র থেকে তথ্য পেয়ে সেই রাতে তাঁকে এবং তাঁর বাবা শরীফ ইমাম ও ভাই সাইফ ইমাম জামীকে গ্রেফতার করে। তেজগাঁও নাখালপাড়ার মিলিটারি টর্চার সেলে তাঁদের উপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় রুমি তাঁর পরিবারকে তাঁর যুদ্ধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করতে বলেন এবং নিজের উপর সমস্ত দায় নেন। তিনি বলেছিলেন, “পাকিস্তানি বাহিনী আমার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানে, আমি নিজেই এর দায় নেব।” এমনকি চরম নির্যাতনের মুখেও তিনি সহযোদ্ধাদের নাম প্রকাশ করেননি। ৩০ আগস্টের পর রুমি, তাঁর সহযোদ্ধা বদিউল আলম, জুয়েলসহ অনেককে আর দেখা যায়নি। ধারণা করা হয়, পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলে। তাঁর এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর হয়ে গেলেন। স্বাধীনতার পর তাঁকে মরণোত্তর বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
রুমির দেশপ্রেম: তরুণদের জন্য শিক্ষা
রুমির জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি দেশপ্রেমের সত্যিকারের অর্থ। তিনি একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ত্যাগ করে, আমেরিকায় পড়াশোনার সুযোগ ফিরিয়ে দিয়ে দেশের জন্য লড়াই করতে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর মা জাহানারা ইমাম তাঁকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “দিলাম তোকে দেশের জন্য কুরবানি করে, যা তুই যুদ্ধে যা।” রুমি উত্তরে বলেছিলেন, “বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন একটা কথা আছে না আম্মা? হয়তো জীবনের পুরোটা তোমাদের মতো জানি না, ভোগও করিনি, কিন্তু জীবনের যত রস-মাধুর্য, তিক্ততা—সবকিছুর স্বাদ আমি এর মধ্যেই পেয়েছি। যদি চলেও যাই, কোনো আক্ষেপ নিয়ে যাব না।” এই কথাগুলো রুমির জীবনদর্শনের প্রতিফলন। তিনি জীবনের সকল সুখ-দুঃখের স্বাদ গ্রহণ করেছিলেন দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে।
রুমির এই ত্যাগ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে শেখায় যে দেশপ্রেম কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, দেশের জন্য কিছু করতে হলে নিজের স্বার্থকে পেছনে ফেলে বৃহত্তর লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। আজকের তরুণদের কাছে রুমির জীবন একটি আলোকবর্তিকা। তাঁর মতো আমাদেরও প্রশ্ন করা উচিত: আমরা আমাদের দেশের জন্য কী করছি? আমরা কি দেশের উন্নতির জন্য, সমাজের কল্যাণের জন্য নিজেদের দায়িত্ব পালন করছি?
শহিদ জননী জাহানারা ইমামের সন্তান
রুমির মা জাহানারা ইমাম তাঁর সন্তানের শহাদতের পরও ভেঙে পড়েননি। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রাখতে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “একাত্তরের দিনগুলি” রুমির জীবন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিত্র। এই বইয়ে রুমির দেশপ্রেম, সাহস, ও ত্যাগের কাহিনী হৃদয়স্পর্শীভাবে ফুটে উঠেছে। রুমির শহাদতের মধ্য দিয়ে জাহানারা ইমাম “শহিদ জননী” নামে খ্যাত হন। তিনি শুধু রুমির মা নন, তিনি সকল মুক্তিযোদ্ধার মা হয়ে উঠেছিলেন।
তরুণদের প্রতি আহ্বান
শাফী ইমাম রুমি আমাদের শেখান, দেশপ্রেম কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি দায়িত্ব। আজকের তরুণরা যখন নিজেদের ক্যারিয়ার, স্বপ্ন, ও ব্যক্তিগত লক্ষ্য নিয়ে ব্যস্ত, তখন রুমির জীবন তাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের স্বাধীনতা এসেছে অগণিত তরুণের রক্তের বিনিময়ে। আমাদের দায়িত্ব এই স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করা, দেশের উন্নয়নে কাজ করা, এবং সমাজের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতা পালন করা। রুমির মতো আমাদেরও নিজেদের জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে হবে এবং দেশের জন্য কিছু করার প্রতিজ্ঞা নিতে হবে।
রুমি আমাদের শিখিয়েছেন, জীবনের মূল্য তখনই পূর্ণতা পায় যখন তা দেশের কল্যাণে উৎসর্গ করা যায়। তাঁর জীবন আমাদের প্রতি প্রশ্ন রাখে: আমরা কি প্রস্তুত আমাদের দেশের জন্য রুমির মতো ত্যাগ স্বীকার করতে? আসুন, রুমির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা প্রতিজ্ঞা করি, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে আরও উন্নত, সমৃদ্ধ, ও মর্যাদাশীল করতে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে কাজ করব। শহিদ রুমির আত্মত্যাগ আমাদের হৃদয়ে চিরজাগরূক থাকুক, আমাদের দেশপ্রেমের পথে আলো দেখাক।
শ্রদ্ধাঞ্জলি শহিদ রুমিকে, যিনি তাঁর রক্ত দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার পতাকাকে আরও উজ্জ্বল করেছেন।
নীচের এই চিঠিটি ১৯৭১ সালের ১৬ই জুন ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা যোদ্ধা শাফী ইমাম রুমী তার মামা সৈয়দ মোস্তফা কামাল পাশার কাছে লিখেছিলেন।
আগরতলা
১৬ জুন, `৭১
প্রিয় পাশা মামা,
অবাক হয়ো না! এটা লেখা হয়েছিল আর তোমার কাছ পর্যন্ত পৌঁছালও। পড়ার পর চিঠিটা নষ্ট করে ফেলো। এ নিয়ে আম্মাকে কিছু লিখে জানানোর চেষ্টা করো না। তাহলে তাদের বিপদে পড়তে হবে।
তাড়াহুড়া করে লিখলাম। হাতে সময় খুব কম। বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে কাল এখান থেকে চলে যেতে হবে।
আমরা একটা ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ লড়ছি। আমরা জয়ী হব। আমাদের সবার জন্য দোয়া করো। কী লিখব বুঝতে পারছি না-কত কী নিয়ে যে লেখার আছে। নৃশংসতার যত কাহিনী তুমি শুনছ, ভয়াবহ ধ্বংসের যত ছবি তুমি দেখছ, জানবে তার সবই সত্য। ওরা আমাদের নৃশংসতার সঙ্গে ক্ষতবিক্ষত করেছে, মানব ইতিহাসে যার তুলনা নেই।
আর নিউটন আসলেই যথার্থ বলেছেন, একই ধরনের হিংস্রতা নিয়ে আমরাও তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। ইতোমধ্যে আমাদের যুদ্ধ অনেক এগিয়ে গেছে। বর্ষা শুরু হলে আমরা আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে দেব।
জানি না আবার কখন লিখতে পারব। আমাকে লিখ না। সোনার বাংলার জন্য সর্বোচ্চ যা পারো করো।
এখনকার মতো বিদায়।
ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাসহ
রুমী
নিচে মূল চিঠিটি দেওয়া হলো যা শাফী ইমাম রুমী ইংরেজিতে লিখেছিলেন।
Agartala
June 16, ‘71
Dearest Pasha Mama,
Don’t be surprised! It was written and has come to pass. And after you read this letter, destroy it. Don’t try to write to Amma about this letter. It will put them in danger.
This is a hurried letter. I don’t have much time. I have to leave tomorrow for my base camp.
We are fighting a just war. We shall win. Pray for us all. I don’t know what to write … there is so much to write about. But every tale of atrocity you hear, every picture of terrible destruction that you see is true. They have torn into us with a savagery unparalleled in human history. And sure as Newton was right, so shall we too tear into them with like ferocity. Already our war is far advanced. When the monsoons come we shall intensify our operation.
I don’t know when I shall write again. Please don’t write to me. And do your best for SHONAR BANGLA.
Bye for now.
With love and regards
Rumi
