পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার প্রচার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন, প্রধান উপদেষ্টাকে ঘিরে ‘ভাড়াটে সমর্থন’

পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার প্রচার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন, প্রধান উপদেষ্টাকে ঘিরে ‘ভাড়াটে সমর্থন’
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজের পর রাষ্ট্রপতি ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে উদ্দেশ করে স্লোগান—”স্যার, আরও পাঁচ বছর থাকুন”—পুনরায় শোনা গেছে আজ কোরবানির ঈদের সকালে। এই একই দৃশ্য ঘটেছিল গত রোজার ঈদেও। দুই ঈদেই এই স্লোগানের পেছনে ছিল একই গোষ্ঠী, একই পরিকল্পনা এবং অর্থের বিনিময়ে ‘ভুয়া সমর্থন’ তৈরির একটি সুসংগঠিত চেষ্টার চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।

ঈদের মতো ধর্মীয় ও সার্বজনীন একটি জাতীয় অনুষ্ঠানে বারবার এমন রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্রপতির চারপাশে গড়ে ওঠা কথিত ‘জনসমর্থনের’ স্বচ্ছতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে।

আজকের ঈদের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যাঁরা স্লোগান দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন গত রোজার ঈদেও একই দাবি তুলেছিলেন। তাঁরা মূলত রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর, রূপনগর, দারুসসালাম, মিরপুর ও গাবতলীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আনা হয়। প্রত্যেকের হাতে নগদ ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ টাকা পৌঁছে দেওয়া হয় ঈদের আগের দিন রাতেই।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশগ্রহণকারী জানান, নামাজ পড়তে যাবে বলছিল। পরে বলল, ইউনুস সাহেবকে কিছু একটা বলতে হবে। আগে যেমন বলছিলাম, এবারও তাই বললাম। টাকা আগেই পাইছি।

একজন যোগ করেন, ঈদের পর বলল ‘স্যার আরও পাঁচ বছর থাকুন’ বললে ভিডিও তুলবে, তারপর বাড়তি টাকা দেবে।

অর্থায়নে এলজিইডি উপদেষ্টা, সমন্বয়ে এনসিপি নেতারা

সূত্র বলছে, পুরো পরিকল্পনার অর্থায়ন করেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। রোজার ঈদের মতো এবারও ঈদের আগের রাতে সরকারি বাসভবন থেকে এনসিপির নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন। এবং এই কৌশল নির্ধারণ করেন ‌।

জানা গেছে, এই পরিকল্পনায় সরাসরি অংশ নেন জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি)-এর কয়েকজন প্রভাবশালী সংগঠক। তাঁদের মাধ্যমে দালালচক্র ভাড়াটে লোক সংগ্রহ করে এবং নির্দিষ্ট চিত্রনাট্য অনুযায়ী স্লোগানদাতাদের নিয়ন্ত্রণ করে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউ য়ে এনসিবির সমাবেশে লোক ভেড়ার দায়িত্বে থাকা লোকরাই ঈদের জামাতেও লোক ভাড়া করেছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে বিডি ডাইজেস্ট।

ঘটনার সারবস্তু বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই বারবারের ভুয়া স্লোগান ও ভিডিও চিত্র মূলত প্রধান উপদেষ্টার চারপাশে কৃত্রিম জনপ্রিয়তার আবরণ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। ঈদগাহের মতো ধর্মীয় স্পেসকে ব্যবহার করে, পবিত্র নামাজের পরিবেশে রাজনৈতিক প্রচারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে সুপরিকল্পিতভাবে—যা প্রথা, শালীনতা ও রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা বিরোধী।

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর নীরবতা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো বাদে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এই ঘটনাকে ‘ধর্মীয় আবেগের অপব্যবহার ও রাষ্ট্রীয় প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ এক নেতা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, জনপ্রিয়তা যদি টাকা দিয়ে কিনে নিতে হয়, তবে তা আর রাষ্ট্রীয় সম্মান নয়—বরং বিশ্বাসহানির প্রতিচ্ছবি। এক ঈদে নয়, দু’টি ঈদেই একই স্ক্রিপ্টে, একই লোক দিয়ে, একই স্লোগান—এটা নিছক কাকতালীয় নয়। বরং একটি সুপরিকল্পিত প্রচার-অভিযান যা রাষ্ট্রের শীর্ষপদে থাকা ব্যক্তিকে ঘিরে কৃত্রিম জনসমর্থন তৈরির প্রচেষ্টা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকাতে বিএনপি’র এক মেয়র প্রার্থী বলেন, এই ধরনের ঘটনার মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার নিরপেক্ষতা, জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোর পবিত্রতা, এবং গণতন্ত্রের প্রতি নাগরিক আস্থা—সবই প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছ তদন্ত দেশের নির্বাচিত সরকার এলেই সম্পন্ন করা হবে।
11:23 AM

Visited 311 times, 1 visit(s) today