নিজস্ব প্রতিবেদক
কোরবানির ঈদের দুদিন পরও ঢাকার বিভিন্ন সড়ক, গলি ও মোড়ে পড়ে আছে উচ্ছিষ্ট, চাটাই, হাড় ও পচা মাংসের টুকরা। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ নগরবাসী। অথচ সিটি করপোরেশনের দাবি—সব বর্জ্য রাতেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
রবিবার দুপুর ৩টার দিকে মোহাম্মদপুরের টিক্কাপাড়া, তাজমহল রোড, রিং রোডের পাশে এবং কিশলয় উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এখনও রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায় কোরবানির বর্জ্য। কোনো এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কর্মী ছিল, কোথাও ছিল না।
মাঠপর্যায়ে থাকা পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বলছেন, বাসা থেকে ময়লা তোলা হলেও মোড় বা খোলা জায়গার আবর্জনা এখনও পড়ে আছে। কখন সেগুলো সরানো হবে, তা নিশ্চিত নয়।
পুরান ঢাকার নাজিরা বাজার, বকশিবাজার ও লালবাগ এলাকাতেও দেখা গেছে একই চিত্র। গলির মুখে পশুর মাথা-পা, চাটাই, পলিব্যাগে ভরা উচ্ছিষ্ট পড়ে রয়েছে। দুর্গন্ধে দুর্বিষহ অবস্থা।
ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের আগাম ঘোষণা ছিল, ১২ ঘণ্টার মধ্যে সব বর্জ্য অপসারণ করা হবে। কিন্তু ৩৬ ঘণ্টা পার হলেও সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি।
সরকারি দাবি: ১০০% অপসারণ!
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া রবিবার দুপুরে ফেসবুকে লিখেছেন, “১২টি সিটি করপোরেশনের ৪৮৭টি ওয়ার্ড—১০০% বর্জ্য অপসারণ রাত ১০টার মধ্যেই!”
তিনি এটিকে ‘পরিশ্রম ও প্রতিশ্রুতির জয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ঈদের দিন সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, “৮৫ শতাংশ বর্জ্য সরানো হয়েছে।”
রবিবার বিকালে পাঠানো সিটি করপোরেশনের তথ্যে দাবি করা হয়—মোট অপসারিত বর্জ্য ১৩ হাজার ১৭৪ টন।
মাঠের বাস্তবতা বলছে অন্য কথা
মোহাম্মদপুরের পরিচ্ছন্নতা কর্মী নার্গিস বললেন, “আগামীকালও ময়লা পরিষ্কার করতে হবে।”
তাজমহল রোডে কর্মী শফিকুল ইসলাম জানান, “মোড়ের ময়লা এখনও আছে। বড় গাড়ি এসে নিয়ে যাবে। তবে কখন আসবে জানি না।”
রিং রোডের পাশে টিক্কাপাড়ায় বর্জ্যের দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, অথচ সেখানে কোনো কর্মী ছিল না।
দক্ষিণ সিটির এলাকাগুলোতেও একই দৃশ্য। পুরান ঢাকার হোসেনী দালাল রোড, লালবাগ, পোস্তা—সবখানেই দ্বিতীয় দিনের কোরবানির বর্জ্য নতুন করে জমেছে।
নাগরিকরা বলছেন, এবার সিটি করপোরেশন নির্ধারিত কোরবানির স্থান তালিকা দেয়নি। ফলে অনেকেই বাসার সামনেই কোরবানি দিয়েছেন। পার্কিং, সড়ক বা গলির মুখেই পশু জবাই হয়েছে।
যেসব এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে রক্ত ও বর্জ্য একাকার হয়ে গেছে। একপাশে জমে থাকা সেই পানি এখন দুর্গন্ধের উৎস।
নাগরিকদের ক্ষোভ
মোহাম্মাদপুরের বাসিন্দা মেহরিন আফরিন বলেন, “বাচ্চা নিয়ে বের হলেই খারাপ লাগছে। এখনও রাস্তায় ময়লা পড়ে আছে।”
ধানমণ্ডি শংকর এলাকার বাসিন্দা সাকিব হাসান বলেন, “রক্ত-মাংস গলির মাথায় পড়ে আছে। সিটি করপোরেশন বলছে পরিষ্কার, কিন্তু আমাদের এলাকায় কিছুই করে নাই।”
চকবাজারের বাসিন্দা আসিফ আহমেদ বলেন, “ময়লার স্তুপে মাছি, পোকা ঘুরছে। রাস্তায় বের হলে কাদা আর রক্তে জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোথায় অভিযোগ করব, বুঝি না।”
পরিকল্পনা বনাম বাস্তবতা
ঢাকায় ঈদুল আজহায় বছরে প্রায় ৫০ হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়। আগে এটি সরাতে তিন দিন লাগত। পরে সেই সময়সীমা নামিয়ে আনা হয় ২৪ ঘণ্টায়, এবার লক্ষ্য ছিল ১২ ঘণ্টা।
এই লক্ষ্যে দুই সিটি করপোরেশন ২০ হাজার ২৬৭ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মীকে মাঠে নামিয়েছে। দেয়া হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ব্যাগ। হটলাইন চালুর কথাও জানানো হয়েছে।
তবু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মাঠপর্যায়ে সেই ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ হয়নি। কোথাও বর্জ্য রয়ে গেছে, কোথাও মানুষই কোরবানি দিয়েছে নিয়ম না মেনে।
আর তাই, সরকারি ‘পরিসংখ্যানের জয়’ আর নাগরিকদের ‘বাস্তব অভিজ্ঞতার পরাজয়’—এই দুইয়ের ফারাক নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছেন ঢাকাবাসী।
