-জাহানারা নুরী
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস বলেছেন, ‘রাখাইনের জন্য বাংলাদেশ করিডর দিয়ে দিয়েছে বলে একটা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমি সুস্পষ্টভাবে বলছি, এটি সর্বৈব মিথ্যা। এটা চিলে কান নিয়ে যাওয়ার গল্প।’
আজ শুক্রবার (৬ জুন) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাখাইন করিডর সংক্রান্ত বিতর্ককে “অপপ্রচার” আখ্যা দিয়ে বিষয়টি নিয়ে চলমান জনমত ও উদ্বেগকে একরকম নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “বাংলাদেশ করিডর দিয়ে দিয়েছে” এমন দাবি ভিত্তিহীন এবং গুজব মাত্র। তবে সরকারের এই অবস্থান স্পষ্ট করা হলেও, সংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক ও মানবিক প্রেক্ষাপটে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই গেছে—যা জনমনে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি ‘অপপ্রচার’ বললেও তার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন কিন্তু বাস্তবভিত্তিক তথ্য দিয়েছিলেন দেশবাসীকে। গত সাতাশে এপ্রিল ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের জন্য শর্ত সাপেক্ষে মানবিক করিডর দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে। জনগণ জানে না, কারু সাথে কোনো আলোচনা ব্যতিরেকে সরকারের ’এই রাজি হওয়া’র বিষয়টি কিভাবে সম্ভব হলো ? সেই নৈতিকভাবে রাজি হওয়ার পর কি বলা চলে পুরো বিষয়টা ’অপপ্রচার’?
মুহাম্মাদ ইউনুসের ভাষণের মূল বক্তব্য এমনতরো- জাতিসংঘ মহাসচিব মার্চ মাসে বাংলাদেশ সফরে একটি “মানবিক ত্রাণ করিডোর”-এর প্রস্তাব দেন রাখাইনে যুদ্ধাবস্থার কারণে। প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, বাস্তবায়িত হয়নি। রাখাইন করিডর সম্পর্কে যেসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো “চিলে কান নিয়ে যাওয়ার গল্প”।
তথ্য নিয়ে খেলাধূলা সেই জুলাই ২০২৪ থেকেই হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য যে অস্পষ্টতা তা বোঝা কঠিন নয় তবে এর পশ্চাতে দায় এড়ানোর যে চেষ্টা লক্ষণীয়, তা জনগণকে কিছুটা বিস্মিত করেছে বৈ কি!
রবীন্দ্রনাথ জানিয়ে গেচেন অনেক আগেই ‘অনেক কথা বলেও কোনো কথা না বলা যায়’ তবে তার ও তার অনুসারীদের ভাষা বোঝার আশা আমরা জলাঞ্জলী দেই নি, তার সঠিক অর্থ অনুধাবনে দেশবাসী ্বএখন পারঙ্গম। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যে জনমনের আশঙ্কা নাকচ করে দেয়ার উন্নাসিকতা আছে, অথচ তার মতো অবস্থানে ও পদে থাকা রাষ্ট্রসেবকের কর্তব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া, যে উত্তর তার যালে যালে পতাায় পাতায় চলা ‘অনেক কথার’ মধ্যে অনুপস্থিত:
প্রথমতঃ প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক জাতিসংঘের প্রস্তাবটি তাদের কাছে কীভাবে এসেছে এবং সরকার যে নীতিগতভাবে সম্মত হলো সে সম্মতি কিভাবে প্রকাশ হলো বা প্রস্তাবটির প্রতি সরকার কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল? প্রস্তাবটি যখন এলো তখন এটি গণমাধ্যমে এলো না কেন? জনগণ জানলো না কেন? এখনও জনগণ ইনটেরিম সরকার কি ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তা জানে না কেন? মোদ্দা কথা হলো তখন সরকার এই বিষয়ে নিরব ছিল কেন?
সরকার বলছে এটি “শুধু প্রস্তাব”, কিন্তু এই প্রস্তাবের লিখিত খসড়া বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি এখনও জনসমক্ষে আসেনি। ফলে, প্রস্তাবের প্রকৃত ধরণ, ভৌগোলিক পরিসর, সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারী পক্ষ ইত্যাদি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো ঠিক কোন্ প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপের পরিপ্রেক্ষিতে রাখাইন করিডরের প্রসঙ্গ উঠলো, কোথা থেকে উঠল, কে তুললো, কখন তুললো?
চীনের নেতৃত্বে রাখাইনের মাধ্যমে একটি অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নের খবর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এটি চীন-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডরের অংশ, যা বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারে। এই রুট কক্সবাজার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছায়।
এই প্রেক্ষিতে যদি বাংলাদেশ “মানবিক করিডর” অনুমোদন করে, তাহলে সেটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা সামরিকভাবে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন উদ্বেগ অমূলক নয়।
তুতীয় প্রশ্ন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা নিয়ে। এই বাস্তবতা কী বলছে? দেশটি ইতোমধ্যে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে আরও এক লাখ নতুন রোহিঙ্গা এসেছে। আসলে এ সংখ্যা দেড় লাখেরও ওপরে। এই বাস্তবতায় রাখাইন সীমান্তে মানবিক করিডর চালু করলে রোহিঙ্গা প্রবাহের ঝুঁকি বাড়বে কি না—সে বিষয়ে তাঁর ভাষণে কোনো ব্যাখ্যা নেই।
তিনি যে ’অপপ্রচার’ বলে দাগিয়ে দিলেন, তা নিশ্চয়ই চিন্তা ভাবনা না করে বলেন নি। তবে বিজ্ঞজনদের এটাকে নাগরিক উদ্বেগ হিসেবেও দেখার সুযোগ রয়েছে।
সরকারের বক্তব্যে যারা সন্দেহ প্রকাশ করছেন, তাঁদের “অপপ্রচারকারী” বা “গুজব রটনাকারী” হিসেবে চিহ্নিত করে কথা বলায় বিষয়টা কেমন দাঁড়ালো? জনগণের সাথে কি সরকার প্রধানের দ্বন্দ্বের সম্পর্ক?তাদের মধ্যে ঠিক কার সাথে তার দ্বন্দ্ব? জনগণের সেই অংশের সাথে, যারা নিজ দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনে কম্প্রোমাইজ করতে রাজি নয়? এই উদ্বেগ কি সত্যিই গুজব? একে কি রাষ্ট্রের স্বচ্ছতার অভাবে জন্ম নেওয়া সংশয় রূপে দেখা যেতে পারে না, যা দেখা অত্যন্ত যৌক্তিক, এবং জনমনের এ জাতীয় সংশয়কে প্রতিহত করার আহ্বান মোটেও যৌক্তিক নয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক মহল থেকে যেসব সতর্কতা আসছে, তার ভেতর সীমান্ত অরক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা, সার্বভৌমত্ব এ সব প্রশ্ন অবশ্যই বিবেচ্য এবং এগুলোকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করলেই বরং বিভ্রান্তি দূর হতো, সংশয় কমানো যেত।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মুহাম্মদ ইউনুস নিজে জনগণের বোঝার সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখেন না, এবং তার সরকারের শুরু থেকেই দেশের বিপুল সঙ্কটকালেও নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ও দেশের জনগণের কাছে তার কোনো ব্যাখ্যা না দেয়ার মানসিকতা, নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ঢাক ঢাক গুড়গুড় আচরণের প্রবণতা। এসবই তথ্য-স্বচ্ছতার পদ রুদ্ধ করেছে ও জনআস্থার সংকট গভীরতর করেছে।
রাখাইন করিডর সংক্রান্ত বিতর্কে মুহাম্মাদ ইউনুসের বক্তব্য বেশ আত্মপক্ষ সমর্থনের মতো শুনিয়েছে। অপপ্রচার হলে আত্মপক্ষ সমর্থন কেন? ঘটনাটা কি সে বিষয়ে জনগণকে আপডেট দেয়া যেতো।। তার সরকার জানায় নি। বিষয়টির গভীরতা এবং জনগণের উদ্বেগ উপেক্ষিত রয়ে গেছে। বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যে কোনো ধরনের করিডোর বা চ্যানেল নিয়ে সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল।
সরকার যদি সত্যিই করিডোর অনুমোদন না দিয়ে থাকে, তাহলে প্রমাণস্বরূপ লিখিত দলিল বা বিবৃতি প্রকাশের মাধ্যমে এই জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটানো দরকার ছিল। অন্যথায়, রাষ্ট্র নিজেই অপপ্রচারের পথ খুলে দিচ্ছে এই ধারণা জনমনে বদ্ধমূল হতে পারে বলেই বিশ্লেষক মহল মনে করছেন।
তারিখ: ৬ জুন ২০২৫
