সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের সাথে যৌন নিপীড়নের এমন সব ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে যে, শিউরে উঠছেন অভিভাবকরা। কিন্তু অসংখ্য সমীক্ষা বলছে, যত ঘটনা প্রকাশ্যে আসছে, সেটা সংঘটিত ঘটনার ৫ শতাংশেরও কম। অধিকাংশ ঘটনা শিশুর হয় বুঝতে পারেনা বলে গুরুত্ব দেয় না অথবা ভয়-ভীতিতে কিংব লজ্জায় প্রকাশ করতে পারেনা। এজন্য অভিভাবকদের সাথে শিশুদের মানসিক দূরত্বটাও বড় কারণ।
তাই বর্তমান সময়ে শিশুর নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে তাকে যৌন নির্যাতন বা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য শিশুকে ছোটবেলা থেকেই “গুড টাচ” (ভালো ছোঁয়া) ও “ব্যাড টাচ” (খারাপ ছোঁয়া) সম্পর্কে সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণভাবে শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। মেয়ে শিশুকে নয় শুধু, ছেলে শিশুর জন্যও এই শিক্ষা জরুরি।
নিচে শিশুদের এই বিষয়ে শেখানোর কিছু কার্যকর কৌশল তুলে ধরা হলো:
১. শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন
প্রথমেই শিশুর সঙ্গে এমন এক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে তার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা খোলাখুলি শেয়ার করতে পারে। শিশুকে বোঝাতে হবে, সে নিরাপদ এবং আপনি তার পাশে আছেন সব সময়।
২. নিজের শরীর সম্পর্কে শেখান
শিশুকে তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ সম্পর্কে জানাতে হবে। হাত, পা, মুখ—এসব যেমন প্রকাশ্য অঙ্গ, তেমনি বক্ষ, যৌনাঙ্গ, নিতম্ব ইত্যাদি ব্যক্তিগত বা ‘প্রাইভেট পার্টস’। বুঝিয়ে বলুন, এই অঙ্গগুলো শুধু নিজে পরিষ্কার করার সময় বা চিকিৎসকের প্রয়োজনে বাবা-মা বা নির্ভরযোগ্য অভিভাবক ছাড়া অন্য কেউ স্পর্শ করতে পারে না।
৩. ‘গুড টাচ’ এবং ‘ব্যাড টাচ’ কী, তা বোঝান
- গুড টাচ হলো এমন ছোঁয়া যা ভালো লাগে, যেমন— মায়ের আদর, বাবার স্নেহের স্পর্শ, শিক্ষক বা বন্ধুর কাঁধে হালকা চাপ, অনুমতি নিয়ে চিকিৎসকের স্পর্শ ইত্যাদি।
- ব্যাড টাচ হলো এমন স্পর্শ যা অস্বস্তিকর, ভয়ানক বা গোপনে করা হয়, যেমন— যৌনাঙ্গে অযাচিতভাবে হাত দেওয়া, জোর করে চুমু খাওয়া বা এমন কিছু বলা বা করা যা শিশুর ভালো না লাগে।
শিশুকে বলুন, তার শরীর তার নিজের, কেউ যদি জোর করে তাকে স্পর্শ করে, তাহলে সে “না” বলতে পারে এবং দ্রুত নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে পারে।
৪. ‘না’ বলতে শেখান
শিশুকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে “না” বলতে শেখান। বলুন, কাউকে ‘না’ বলা খারাপ নয়, বরং নিজের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয়। এটি তার অধিকার।
৫. গোপন কথা বলার গুরুত্ব বোঝান
শিশুকে বোঝান, কেউ যদি বলে “এটা গোপন রাখো, কাউকে বলবে না”, তাহলে সেটি সন্দেহজনক হতে পারে। ভালো বিষয় কখনো গোপন রাখতে হয় না। বলুন, যদি কোনো কিছু তাকে অস্বস্তিতে ফেলে, তাহলে তা অবিলম্বে মা-বাবা বা নির্ভরযোগ্য কাউকে জানাতে হবে।
৬. রোল-প্লে বা নাটকের মাধ্যমে শেখানো
শিশুদের শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো খেলাধুলা বা নাটকের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া। আপনি ও শিশু মিলে গুড টাচ ও ব্যাড টাচ নিয়ে ছোট ছোট নাটকে অংশ নিতে পারেন। এতে বিষয়টি সে আরও ভালোভাবে বুঝবে।
৭. নিয়মিত সময় দিন ও পর্যবেক্ষণ করুন
শিশু সারাদিন কোথায় যায়, কার সঙ্গে সময় কাটায়, আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না—এই বিষয়গুলো নিয়মিত লক্ষ্য করুন। যদি কোনো অস্বাভাবিক আচরণ (যেমন চুপচাপ থাকা, আতঙ্কিত হওয়া, নির্দিষ্ট কাউকে এড়িয়ে চলা ইত্যাদি) লক্ষ্য করেন, তাহলে যত্নসহকারে তার সঙ্গে কথা বলুন।
৮. বিশ্বাস গড়ে তুলুন
শিশু যেন জানে, সে কোনো অন্যায় বা খারাপ ঘটনার শিকার হলেও বাবা-মা তাকে দোষারোপ করবে না, বরং তাকে সাহায্য করবে—এই বিশ্বাস শিশুর মনে থাকা জরুরি।
পরিশেষ
শিশুকে গুড টাচ ও ব্যাড টাচ সম্পর্কে শেখানো কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়, বরং তার নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বয়স অনুযায়ী সঠিক ভাষা ও পদ্ধতিতে তাকে সচেতন করে তুলুন। মনে রাখবেন, সচেতন শিশু মানেই নিরাপদ শিশু, আর নিরাপদ শিশু মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
আপনার সন্তানকে এই শিক্ষা দিন আজই—ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি অমূল্য উপহার।
