নিজস্ব প্রতিবেদক
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তালেবানের পক্ষে লড়াইয়ে অন্তত একাধিক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তারা আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তালেবানের হয়ে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।
গত কয়েক মাস ধরে এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। নিরাপত্তা সূত্র জানায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কিছু যুবক গোপনে তালেবানের সঙ্গে যোগ দিয়ে অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করতেন। সেখানে তালেবানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ নিতেন।
গত ২৭শে এপ্রিল পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে পাক-আফগান সীমান্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভিযানে তালেবান-সংযুক্ত তেহরিক ই তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) গোষ্ঠীর ৫৪ সদস্য নিহত হয়েছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বলেছে, আফগানিস্তান থেকে অনুপ্রবেশের সময় তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে।
নিহতদের তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তবে তাদের মধ্যে অন্তত একজন বাংলাদেশি তরুণ আহমেদ জোবায়ের ছিলেন। তিনি ঢাকার সাভারের আড়াপাড়ার বাসিন্দা। স্থানীয়রা তাকে ‘যুবরাজ’ নামে চিনতেন।
জোবায়েরের মা আলেয়া আক্তার জানান, এপ্রিল মাসের শেষ দিকে কেউ ফোন দিয়ে জানায় তার ছেলে ‘শহীদ’ হয়েছে। কলারের পরিচয় তিনি জানেন না, তবে বলা হয়েছিল জোবায়ের ‘জান্নাতের পাখি’ হয়ে গেছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, তালেবানের কার্যক্রম মূলত পাকিস্তানের কাশ্মীর ও অন্যান্য নাশকতার হাইভোল্টেজ এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। তালেবান ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশি গেরিলাদের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানি সেনারা তালেবানের অবস্থান ধ্বংসে কঠোর অভিযান চালাচ্ছে। নিহতদের মধ্যে কিছু কিশোরও রয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, দেশের কিছু তরুণকে বিদেশি গেরিলা সঙ্গঠনের সঙ্গে যোগ দিয়ে সেখানে পাঠানো হচ্ছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থানীয় ও বিদেশি গেরিলাদের মিশ্রণের মাধ্যমে তালেবানের শক্তি বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এই গেরিলাদের নাম এবং কার্যক্রম সম্পর্কিত তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এটি দেশীয় নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য বড় সতর্ক সংকেত।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমিনুল হক বলেছেন, এই ধরনের কার্যক্রম সাম্প্রদায়িক উগ্রতা ও জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটাতে পারে। বিদেশি গেরিলা কার্যক্রম দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
সরকার এখনও এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে গোয়েন্দারা গেরিলা কার্যক্রম রোধে তৎপর রয়েছেন।
সেনা ও পুলিশ সূত্র জানায়, গেরিলা কার্যক্রমে যুক্ত অনেক যুবক মাদকাসক্ত এবং অর্থের জন্য এই কাজে নামছেন। একবার আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর দেশে ফিরে আসার পথও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমিনুল হক বলছেন, এই প্রবণতা বাড়লে দেশের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তার অবস্থা জটিল হতে পারে।
তালেবান ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক সংঘর্ষ এবং সেখানে পরিস্থিতির অবনতি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। এই ধরনের সংঘর্ষ ও গেরিলা কার্যক্রম দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করবে।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বিদেশি গেরিলাদের দেশে প্রবেশ রোধ এবং স্থানীয়দের এ ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়া বন্ধে নানা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আমিনুল হক আরও বলেছেন, সরকারকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি যুবকদের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। তবে বর্তমানে দেশে কিছু জায়গায় উগ্রবাদ বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ এবং কাউন্টার টেরোরিজম বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, এ বিষয়ে তাদের কাছে সাম্প্রতিক পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ প্রধান মো. মাসুদ করিম বলেন, “আহমেদ জোবায়েরের মৃত্যুর বিষয়ে আপডেট তথ্য নেই।”
