কারাগারে মানবাধিকার লঙ্ঘন: জামিনের পরও মুক্তি পাচ্ছেন না ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা

কারাগারে মানবাধিকার লঙ্ঘন: জামিনের পরও মুক্তি পাচ্ছেন না ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৪ই মে, ২০২৫

গত বছরের জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের ফলে হামলা-সংঘাতের মাধ্যমে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন ঘটে। এরপর খড়গ নেমে আসে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর। সারাদেশে হত্যা করা হয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে, তাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবই ধ্বংস করা হয়। মানবাধিকার লঙ্ঘন বাড়তে থাকে ক্রমশ, গণহারে গ্রেপ্তার শুরু করা হয় নেতাকর্মীদের, মামলা থাকুক না থাকুক।

মামলা ও গ্রেপ্তার বাণিজ্য বাড়তে থাকে। হাজার হাজার জ্ঞাত-অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে মামলা হয়। সারাদেশে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তালিকা ধরে ধরে নাম যুক্ত করা হয়। নাম যুক্ত করা কিংবা মামলা থেকে নাম প্রত্যাহারের নামে শুরু হয় চাঁদাবাজি। আওয়ামীলীগ এবং এর অঙ্গ সংগঠনের পক্ষ  থেকে দাবী করা হয়েছে সারাদেশে প্রায় ৫১ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে। যার অধিকাংশই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।

জানা গেছে, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদেরকে কারাগারে ‘কনডেম সেল’-এ (ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের সেল) রাখা হচ্ছে। তারা যে ফ্লোরে রয়েছেন, সেখান থেকে অন্য কোথাও হাঁটাচলার অনুমতি নেই তাদের। এমনকি ক্যান্টিনেও যাওয়া নিষেধ। একটি ছোট কক্ষে ৬-৭ জনকে গাদাগাদি করে রাখা হয়। গুরুতর অসুস্থ হয়ে একেবারে শয্যাশায়ী না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। এরমধ্যে আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী মারা গেছেন কারাগারে।

যেসব ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, তাদের প্রথমে একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সেই মামলায় জামিন পেলেও, জেল কর্তৃপক্ষকে ‘প্রসিকিউশন ডিপার্টমেন্ট’-এর (ডিসি প্রসিকিউশন) পক্ষ থেকে জানানো হয়—তাদের মুক্তি দেওয়া যাবে না। ফলে জেল গেটেই নতুন মামলায় আবার গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এসব নতুন মামলার অনেক সময় কোনো সুনির্দিষ্ট নাম নেই, ‘অজ্ঞাতনামা’ হিসেবে আসামি বানানো হয়। শুধু ছাত্রলীগ কর্মী পরিচয়ের কারণেই জামিন পেলেও তাদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না—এমন নির্দেশনা দেওয়া হয় ডিসি প্রসিকিউশন ও স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি)-এর পক্ষ থেকে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের এমন কয়েকটি ঘটনা (উদাহরণ):

  • কাজল দাস, জগন্নাথ হল ছাত্রলীগের সভাপতি, শাহবাগ থানায় দায়ের হওয়া ১৮/১০ নম্বর মামলায় জামিন পান। কিন্তু জেলগেটে পৌঁছানোর পর পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) তাকে একটি নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মুক্তি আটকে দেয়।

  • লিপ্টন ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নাটক ও বিতর্কবিষয়ক উপ-সম্পাদক, একটি  মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে জামিন পান। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমাও দেন। কিন্তু ডিসি প্রসিকিউশনের আপত্তির কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি।

  • সজীব, বিজয় একাত্তর হল ছাত্রলীগের সভাপতি, একাধিক মামলায় জামিন পেলেও তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। বরং তাকে আরও কয়েকটি নতুন মামলায়, ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামি সাজিয়ে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

  • কামাল উদ্দিন রানা, শহিদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগ সভাপতি, একাধিক মামলায় জামিন পেলেও জামিনের পর আদালত থেকে জারি হওয়া স্থগিতাদেশের (স্টে অর্ডার) কারণে তার মুক্তি আটকে দেওয়া হয়।

  • রাকিবুল ঐতিহ্য, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি, বৈধ জামিননামা নিয়ে জেলগেটে পৌঁছান। কিন্তু তার মামলায় হঠাৎ জারি হওয়া স্টেস্থগিতাদেশের কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি।

মামলায় জামিন বাতিল এবং স্থগিতাদেশ সম্পর্কে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন কর্মকর্তা জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যেমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে. তার বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই তাদের।

গ্রেপ্তারের বিষয়েও তারা জানালেন, পুলিশ এবং আইনপ্রয়োগকারী অন্য সংস্থাগুলোর ওপর নির্দেশনা রয়েছে, প্রতিদিনই একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘লীগ’ কর্মী আটক করে বিভিন্ন মামলায় আসামি হিসেবে কারাগারে পাঠানোর। এটা ‘রুটিন ওয়ার্ক’ হিসেবে করতে হচ্ছে, অন্যথায় তিরস্কৃত হতে হচ্ছে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা, ফ্যাসিবাদের দোসর, এমন ‘ট্যাগ’ খেতে হচ্ছে। চাকরির স্বার্থে ‘অপ্রিয়’ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে পুলিশ।

যদিও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এভাবে গণহারে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা বন্ধ করার কথা বলেছিলেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, এসব মামলার ৯০ শতাংশেরই কোন ভিত্তি নেই। তার এমন বক্তব্যের পরেও গণহারে মিথ্যা মামলা আর বিচার-বহির্ভূতভাবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আটক-গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানো বন্ধ হচ্ছে না।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, আইন উপদেষ্টা গণমাধ্যমের সম্মুখে সুশাসনের আশ্বাস দিলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এই পরিস্থিতির সাথে তুলনা করা যায় স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের সময় গঠিত ক্যাঙারু কোর্টের সাথে। নাম ধরে ধরে ফাঁসিতে ঝোলানো হচ্ছে না এখন, এটুকুই শুধু পার্থক্য।

Visited 62 times, 1 visit(s) today