ইউনূসের অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞায় দেশে ফেরা হচ্ছে না তারেক রহমানের

ইউনূসের অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞায় দেশে ফেরা হচ্ছে না তারেক রহমানের
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক | ৪ঠা মে, ২০২৫

গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে একে একে সব মামলা থেকে খালাস পাচ্ছেন তারেক রহমান। এক-এগারোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দায়ের করা দুর্নীতিসহ বিভিন্ন মামলায় রেহাই পেয়েছেন তিনি। এমনকি একুশে আগস্টের নৃশংসতম গ্রেনেড হামলা মামলা, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার মত মামলাগুলো থেকেও তাকে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে ইউনূস সরকারের এই আমলে। যা নিয়ে রীতিমত বিস্মিত আন্তর্জাতিক মহলও।

তারেক রহমানের প্রায় সব মামলাই খারিজ হযে যাওয়ার পর বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন, এই বুঝি তাদের নেতা দেশে ফিরে আসছেন! গত এক দশক ধরে বিএনপির নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।

এরমধ্যে তার মা খালেদা জিয়া কয়েকবার লন্ডনে গিয়ে তার সাথে দেখা করেছেন, বিএনপির নেতারাও নিয়মিত যাওয়া-আসা করেন, এমনকি এবার তার স্ত্রী এত বছর পর দেশে ফিরছেন শাশুড়ির সাথে, কিন্তু তারেক রহমান ফিরছেন না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশে না ফেরার কারণ থাকলেও এখন কেন ফিরতে পারছেন না, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটা একটা বড় প্রশ্ন।

তবে ইউনূস-সরকারের অভ্যন্তরীণ বিশেষ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সহসাই দেশে ফেরা হচ্ছে না তারেক রহমানের। ইউনূস-সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা মোতাবেক যুক্তরাজ্য দূতাবাস থেকে তারেককে পাসপোর্ট দিতে নিষেধ করা হয়েছে।

লন্ডন বিএনপির অন্তত ৯ জন নেতা জানিয়েছেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার সাথেই তারেক রহমানকে নিয়ে দেশে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইউনূস-সরকারের পক্ষ থেকে তারেকের প্রত্যাবর্তন ঠেকানো হয়েছে।

বিএনপির এই নেতাদের দাবি, খোদ ড. ইউনূসই যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতকে তারেক রহমানের পাসপোর্ট রি-ইস্যু করতে সরাসরি নিষেধ করেছেন।

প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, তারেক রহমান ব্রিটিশ সরকারের অনুমতি নিয়েই বসবাস করছেন, সেখানে বিনিয়োগ করেছেন বিভিন্ন ব্যবসায়। কিন্তু এত বছরেও তিনি তার ‘হাতে লেখা’ বাংলাদেশি পাসপোর্টটি নবায়ন করেননি। এরমধ্যে এমআরপি পাসপোর্ট চালু হওয়ার পরেও তিনি তার পুরনো পাসপোর্টের পরিবর্তেন নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করাননি। এমনকি তার বাংলাদেশি এনআইডি পর্যন্ত নেই। তার বাংলাদেশি পাসপোর্টটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে অনেকদিন আগেই।

বাংলাদেশে ফিরতে হলে তার একটি বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রয়োজন, পাসপোর্টের জন্য এনআইডি কার্ডসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্রও প্রয়োজন। কিন্তু তারেক রহমান এর কোনোটির জন্য আবেদন করেননি কিংবা আবেদন করতে দেওয়া হয়নি তাকে। অন্তত এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যদিও তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব রয়েছে বলে একটা জনশ্রুতি রয়েছে। অথবা তিনি ব্রিটিশ সরকারের ট্রাভেল পাস ব্যবহার করছেন।

কেননা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি সপরিবারে একাধিকবার সৌদি আরবে হজ-ওমরা করতে গেছেন, দুবাইতে ভ্রমণে গেছেন বলে তথ্য রয়েছে। যদি তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব কিংবা ট্রাভেল পাস ব্যবহার করেন, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে ফিরতে হলে তাকে ভিসা নিতে হবে। হয়ত তাকে ভিসা দেওয়া হচ্ছে না। অন্যথায় তাকে বাংলাদেশি পাসপোর্টে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যদিও এ নিয়ে বিএনপির কোনো সিনিয়র নেতা মুখ খুলতে রাজি হননি।

তবে লন্ডন বিএনপির নেতাদের ভাষ্য মতে, এসব নিয়ে খালেদা জিয়া যুক্তরাজ্য হাইকমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দরকষাকষি করেছেন। তাই তারও ফিরতে দেরি হয়েছে, তার আরও আগে দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে কোন সমাধান না হওয়ায় আপাতত খালেদা জিয়া দেশে ফিরছেন তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদাকে সাথে নিয়ে।

লন্ডনে অবস্থানরত একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, তারেককে দেশে ফেরানোর জন্য খালেদা জিয়া আপ্রাণ চালিয়ে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। যদিও ইউনূস-সরকারের শীর্ষ পর্যায় বিষয়টি সুরাহা না করে ঝুলিয়ে রেখেছে। খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তারেক রহমানের পাসপোর্ট রি-ইস্যুর অনুরোধ করা হলেও সাড়া দেয়নি সরকার।

অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে তারেক রহমান যেন দেশে ফিরতে না পারেন, সেজন্য পাসপোর্ট রি-ইস্যুর ওপর অনানুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলে প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, উনার (তারেক রহমান) পাসপোর্ট রি-ইস্যু হবে কীভাবে? আমরা তো জানি উনি ব্রিটিশ সরকারের রেসিডেন্সিয়াল পারমিট রিসিভ করেছেন উনার বাংলাদেশি পাসপোর্ট সারেন্ডারের পরেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে লন্ডন হাইকমিশন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরার ব্যাপারে কোন গ্রিন সিগন্যাল সরকারের তরফ থেকে আসেনি। উনি ‘কনভিক্টেড’ এখনও। উনার প্রেজেন্ট স্ট্যাটাস সম্পর্কে কোনো ক্লিয়ারেন্স পাইনি। ফলে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার মত অথরিটি আমাদের নেই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি পারমিশন দেন, তাহলে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারব। আমাদের হাত-পা বাঁধা। সরকারের নির্দেশনা পেলে তারেক রহমানকে দেশে ফেরানের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

এদিকে, তারেক রহমানকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব দীর্ঘদিনের সঙ্গী জামায়াতের। সাথে রয়েছে এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলও। তাদের মতে, বর্তমানে বিএনপি দেশের পরিবেশ নস্ট করছে। ৫ই আগস্টের পর দেশজুড়ে দলটির নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারি, লুটতরাজসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। তারেক রহমান দেশে ফিরলে এসব কার্যকলাপ সরকারের নিযন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। নতুন করে হাওয়া ভবন, খোয়াব ভবন চালু হবে। তাই এখনই তাকে দেশে ফেরানো উচিত হবে না।

Visited 3,002 times, 1 visit(s) today