মায়ানমারে চীনা বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার প্রবেশাধিকার দিতে জান্তা সরকারের নতুন আইন জারি

মায়ানমারে চীনা বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার প্রবেশাধিকার দিতে জান্তা সরকারের নতুন আইন জারি
শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ঢাকা, ২২ এপ্রিল ২০২৫: মায়ানমারের সামরিক জান্তা মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা আইন প্রণয়ন করেছে, যা চীনের বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে মায়ানমারে মোতায়েনের অনুমতি দেয়। এই আইনের লক্ষ্য চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-সহ দেশটির বিভিন্ন স্বার্থ রক্ষা করা। গত বছর ২২ অক্টোবর যৌথ উদ্যোগে একটি নিরাপত্তা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রায় চার মাস পর এই আইন প্রণয়ন করা হলো।

বিশ্লেষকদের মতে, যদিও আইনটি বিদেশি কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্সের জন্য আবেদনের অনুমতি দেয়, তবে এটি মূলত জান্তার অন্যতম মিত্র চীনকে সুবিধা দেওয়ার জন্য তৈরি। চীন তার প্রকল্প, ব্যবসা এবং কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য জান্তার উপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করে আসছে এবং যৌথ নিরাপত্তা কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবও চীনের পক্ষ থেকে এসেছিল।

গত চার বছরে জান্তা চীন সীমান্তবর্তী উত্তর ও উত্তর-পূর্ব মায়ানমার থেকে পশ্চিমের রাখাইন রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, যেখানে চীনের বিআরআই প্রকল্পগুলো অবস্থিত। অনেক প্রকল্প এলাকা এখন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে। এই পরিস্থিতিতে চীন নিজের হাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে মায়ানমারে বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আইনের মূল বিষয়বস্তু

এই আইন চীনা নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোকে মায়ানমারজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেবে, কারণ চীনা প্রকল্পগুলো দেশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এই কোম্পানিগুলো কেবল চীনা সংস্থা, প্রকল্প এবং কোম্পানির জন্যই নয়, চীনা নাগরিক এবং সরঞ্জাম জড়িত সর্বজনীন ইভেন্টের জন্যও নিরাপত্তা সেবা প্রদান করতে পারবে।

আইন অনুযায়ী, নিরাপত্তা সেবা প্রদানের স্থানে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে এই কোম্পানিগুলো অপরাধীকে আটক করে নিকটবর্তী থানায় হস্তান্তর করতে পারবে। ফলে চীনা দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ, চীনা কারখানায় ভাঙচুর বা চীনা প্রকল্পে বাধাদানকারী কার্যক্রম কঠোরভাবে দমন করা হতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

আইনে আরও বলা হয়েছে, জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে বিদেশি কোম্পানিগুলো অস্ত্র বহন করতে পারবে। তবে তাদের কর্মীদের কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ মায়ানমারের নাগরিক হতে হবে এবং কোনো বিদেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য হওয়া যাবে না।

এছাড়া, নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোকে জান্তার নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগ কার্যক্রমে সহায়তা করতে, জান্তার নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করতে এবং জান্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করতে বাধ্য করা হয়েছে, যা জান্তার জন্য ব্যাপকভাবে সুবিধাজনক।
সমালোচনা ও উদ্বেগ

এই আইনের মাধ্যমে মায়ানমারের সংবিধানের সেই বিধানকে এড়ানো হয়েছে, যা বিদেশি সেনা মোতায়েন নিষিদ্ধ করে। সমালোচকরা বলছেন, এটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত। এছাড়া, চীনা সরকার সম্প্রতি মায়ানমারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ৫০ লাখ ইউয়ান (প্রায় ৬,৮৬,০০০ মার্কিন ডলার) প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা চীনা নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোর উপর জান্তার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

জান্তা দেশব্যাপী সশস্ত্র বিদ্রোহের মধ্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিক সমর্থনের জন্য চীনের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। এই আইনের মাধ্যমে চীনা নিরাপত্তা কোম্পানিগুলো মায়ানমারে প্রভাব বিস্তার করলেও, জান্তার প্রভাব কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা তদারকি কমিটির চেয়ারম্যান হবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এবং পুলিশ প্রধান থাকবেন ভাইস-চেয়ারম্যান। এই পদক্ষেপকে অনেকে মায়ানমারের স্বাধীনতার উপর হুমকি হিসেবে দেখছেন, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।

Visited 84 times, 1 visit(s) today