শামীম আহমেদ।
মানুষ হত্যা কি বাংলাদেশে ডাল-ভাত হয়ে গেছে? ভাববেন না কেবল ইউনুস সরকারকে সমালোচনার জন্য বলছি। আওয়ামী লীগের সময়েও নানা পত্রিকায়, টিভির সংবাদে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতাম ঢাকার অদূরে সাভারে, গাজীপুরে ধানক্ষেতের মধ্যে, খাল-বিলের মধ্যে লাশ পাওয়া যেত। ইটের ভাটিতে পোড়া কংকাল পাওয়া যেত। তবে তখন বিষয়টা ছিল এমন যে খুন করা হতো গোপনে, তারপর খুন করার কথা কেউ স্বীকার করত না, এবং বেশ কিছুদিন পর লাশগুলো পাওয়া যেত।
এখন পার্থক্য হচ্ছে খুন করে কেউ আর লুকিয়ে রাখছে না। ৫ অগাস্ট ২০২৪ এর পর বাংলাদেশের মানুষ বোধহয় খুন করার অধিকার পেয়ে গেছে। ৫ থেকে ৮ অগাস্ট বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষ হত্যার পর ইউনুস সরকার যখন হত্যাকারীদের ইনডেমনিটি দিল, অর্থাৎ এই সময়ে যারা খুন করেছে তাদের বিচার হবে না বা মামলা নেয়া যাবে না এই মর্মে অধ্যাদেশ জারি করল, তারপর থেকে দেশে হত্যা-খুন-জখম-রাহাজানি বেড়ে গেল। যে কোন কিছু করে “আমি বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা” এবং/অথবা “বিপ্লবে এমন অনেক কিছুই হয়” বললেই আর কোন জবাবদিহিতা করা লাগে না।
ইউনুস সরকারের হিসাব অনুযায়ী ১৫ জুলাই থেকে ৫ অগাস্ট ২০২৪ মোট নিহতের সংখ্যা ৪০০ জন। আমি এদের শহিদ বলি না। আমি ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ করে নিহত হয়েছেন কেবলমাত্র তাদেরই শহিদ বলি। এমনকি বঙ্গবন্ধু বা জিয়াউর রহমান বা বুদ্ধিজীবীদেরও আমি শহিদ বলি না। আমার কাছে শহিদ একদমই সুনির্দিষ্ট, যারা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে নিহত হয়েছেন তারা। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও অগাস্ট ষড়যন্ত্রে ইউনুস, পঞ্চতান্ডব ও ডার্টি মাস্টারমাইন্ডসদের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৪০০ জন। অথচ জুলাই অগাস্ট এই দুই মাসে বাংলাদেশ পুলিশ খুন হয়েছে ৩ হাজার। এই সংখ্যা উল্লেখ করেছেন রাষ্ট্রদূত হারুন আল রশিদ ভাই-ও। এর বাইরে আওয়ামী নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ হিসেবে আনলে, গত ৮ মাসে প্রতিদিন নিহত মানুষের সংখ্যা যোগ করলে – সেটি কত হাজার হয় আমার ধারণার বাইরে।
এসবের বাইরে ভাত খাইয়ে পিটিয়ে মারা, কারও দিকে তাকিয়ে হাসার অপরাধেও মেরে ফেলা হয়েছে মানুষকে। মেরা ফেলার পর তারা খুনীরা নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়েছে এই বলে যে তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা। এদের মাস্টারমাইন্ডসদের যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন ৫ অগাস্টের পর হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা কোন বাকস্বাধীনতা, কোন আইনের শাসন, কোন নির্বাচনের অংশ – তখন তাদের উত্তর – ফ্যাসিস্ট বা তাদের সমর্থকদের মেরে ফেললে সেটা কোন অপরাধ নয়।
এই হত্যাকারী ইউনুস সমর্থকদের নিচের দিকে যারা কর্মী শ্রেণীর অথচ নিজেদের নেতা মনে করে তাদের বেশীরভাগই বক-ধার্মিক। অর্থাৎ এরা নামাজ-কালাম করল কী না বিষয় না, মদ গাঁজা খেল কিনা বিষয় না, ফ্যাসিস্ট হত্যা করলেই বিরাট ইসলাম পালন হয়ে যায় এইসব জিহাদিদের কাছে। অথচ এরা যাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে সেই বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ৫৪ বছরে ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী ধর্ম কর্ম করা দুইজন রাজনৈতিক নেতা। তারপরও কেন এরা ইসলামী লেবাস নিয়ে আওয়ামী লীগের বিরোধীতা করে? কারণ একটাই, বাংলাদেশ যুদ্ধ করে পাকিস্তানকে পরাজিত করেছে, আর এইসব উগ্র অন্ধ জিহাদিদের কাছে ইসলাম মানেই পাকিস্তান, ইসলাম মানেই সৌদি আরব!
আমার এক পাঠক আমার একটি লেখার নিচে একটা দূর্দান্ত কমেন্ট করে আমাকে একটা দারুণ জিনিস মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে ৭০ এর নির্বাচনের কথা ভাবতে বলেছিলেন। সেই ৭০ এর নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ৭৫ শতাংশের কিছু কম ভোট পেয়েছিল, অর্থাৎ এই বাঙ্গালদেশেই ১৯৭০ সালে প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ পাকিস্তান পিপলস পার্টি, জামায়েত ইসলামী ইত্যাদি দলকে ভোট দিয়েছিল যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী ছিল। অর্থাৎ ৭ কোটি জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ প্রায় দেড় কোটি মানুষ তখনও বাংলাদেশ চায় নাই। যদিও ভোটার সংখ্যা ৭ কোটি ছিল না কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধিত্বটা এমনই হবে। এই দেড় কোটি পাকিবীর্য ৫৪ বছরে বেড়ে ৬ কোটি না হলেও কোটি খানেক তো হয়েছেই।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে তারা নিয়ন্ত্রণে ছিল। শেখ হাসিনা জঙ্গীদের চারিত্রিক পরিবর্তনে ব্যর্থ হলেও তাদের দমনে সফল ছিলেন। যেই কারণে তার পতনের পর পর এইসব জঙ্গীরা তাদের চেহারা দেখানো শুরু করেছে। এদের নিচের দিকের সমর্থকরা নির্বোধ ও ধর্মীয় জঙ্গী আবার এদের মাস্টারমাইন্ডসরা সব লিবারেল উচ্চবিত্ত উচ্চশিক্ষিত নাস্তিক। আজব এই গোষ্ঠীর কাছে হত্যা-খুন-জখম কোন কিছুই কোন অপরাধ নয়। তাদের না জবার দিতে হয় আল্লাহর কাছে; না জবার দিতে হয় রাষ্ট্রের কাছে। নির্বিচারে হত্যার অধিকার তারা প্রতিষ্ঠা করেছে গত ৫ অগাস্ট ২০২৪ এ।
বর্তমানে পরিস্থিতি অভাবনীয় খারাপ হয়েছে, কিন্তু তার মানে আগে খুন হয়নি তা তো নয়। আমি লেখার সূত্রপাত করেছি আওয়ামী লীগের শাসনামলে পাওয়া লাশ নিয়ে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলটুকুকে আমি গ্রেস পেরিয়ড দিব, কারণ একটা নতুন দেশ স্বাধীন হবার পর আইনশৃঙ্খলা খারাপ থাকতেই পারে। পাকিস্তানের মত একটা পরাশক্তিকে পরাজিত করে নতুন করে পুলিশ, আর্মি সব তৈরী করা সহজ কথা নয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা এবং ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কার্যত খুনের রাষ্ট্রে পরিণত হয়। জিয়াউর রহমান বেছে বেছে প্রায় এক হাজার মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের খুন করে এবং জামায়েতকে পুনরায় বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করে এবং বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পুরস্কারস্বরূপ নানা দেশের রাষ্ট্রদূত বানিয়ে নিরাপদে পার করে দিয়ে এই প্রথাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত করেন।
কিন্তু ১৯৯১ সালে সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর মনে হচ্ছিল এ দেশের আশা আছে। নানা ঘাত প্রতিঘাত দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে হলেও দেশটা এগিয়েছে ৪ অগাস্ট ২০২৪ সাল পর্যন্ত। কিন্তু ইউনুস ৮ অগাস্ট দায়িত্ব নিয়েই জিয়াউর রহমান মডেলে তার অনুসারীদের সমস্ত খুনকে বৈধতা এবং খুনীদের তার নিয়োগকর্তা ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশকে কার্যত ১৯৭৫ পরবর্তী অন্ধকার সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। এখন এই দেশে যে কেউ যে কাউকে যে কোন অজুহাতে হত্যা করে নিজেদের কেবল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ঘোষণা করলেই মাফ পেয়ে যেতে পারে। সাথে কেবল যাকে হত্যা করা হয়েছে তাকে ফ্যাসিস্টের দোসর ট্যাগ দিলে ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যায়।
এই দেশের মানুষ নামাজ পড়তে পড়তে কপালে দাগ ফেলে দেয়, কিন্তু রাস্তায় কুকুরের ডাক শুনলে তাদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। এরা আল্লাহর সৃষ্টি কুকুর বেড়ালদের নির্বিচারে হত্যা করে বুনো আনন্দ অনুভব করে। এরা ঘুষ খেয়ে হজ করে, রিকশাওয়ালাকে থাপ্পড় দেয়াকে জায়েজ মনে করে আর কাজের বুয়ার ছুটি নেয়াকে কবিরাহ গুনাহ মনে করে।
একটা দেশের মানুষ যখন এমন হিংস্র আর বুনো হয়, তখন সেই দেশে কে সরকারে আসল গেল তাতে কী আদতে কিছু যায় আসে? এই ভয়াবহ মনোবৈকল্যে ভোগা জাতিটাকে সামলে ওঠার জন্য সামনে কেমন সরকার আমাদের দরকার আমি জানি না। কিন্তু একটা জাতিগত মানসিক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আমরা ভুগছি এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই।
কবে আমরা এই নির্বিচারে খুনের সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পাব, তাও জানি না। আমার ধারনা আমাদের দেশের চাইতে সুজলা সুফলা দেশ দুনিয়াতে আর দ্বিতীয়টা নাই, এমন দেশটা কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি ইত্যাদি টাইপের যে জাতীয় মিথ্যাচার আমাদের কবি সাহিত্যিকরা করে গেছেন বাংলাদেশ নিয়ে – তাতে করে আমাদের মধ্যে একটা মিথ্যা অহমিকা ঢুকে গেছে। আমাদের কবি সাহিত্যিকরা বোধহয় কেবল সৌদি আরব আর আফ্রিকার সাহারা মরুভুমি দেখে দেশ নিয়ে সব গান কবিতা রচনা করে ফেলেছিলেন, তাই নিজেদের নিয়ে আমরা একটা ভ্রান্ত ধারণায় থাকি। আমাদের মতো জঙ্গী বর্বর জাতি পৃথিবীতে খুব কমই আছে, এই দেশের সবুজও পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশের চাইতে কম। এই দেশের চাইতে নোংরা ও পরশ্রীকাতর দেশ আমি অন্তত দুনিয়াতে দ্বিতীয়টা দেখিনি। অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার আমরা ছোটকাল থেকে শুনে এসেছি এর চাইতে সুন্দর দেশ আর নাই, আমাদের চাইতে সরল মানুষ আর নাই! হয়ত এই কারণেই আমরা নিজেদের আর উন্নত করার চেষ্টাই করি নাই।
জানি না এই দেশের মানুষের বর্বরতার শেষ হবে কোথায়-কবে-কীভাবে! তবে ততদিন দয়া করে কেউ কারও দিকে তাকিয়ে হাসবেন না। এই দেশে কাউকে খুন করলে বিচার হবে না, কিন্তু আপনি কারও দিকে তাকিয়ে হাসলে খুন হয়ে যাবেন।
লেখক পরিচিতি
শামীম আহমেদ
গবেষক, লেখক।
কানাডা
Visited 53 times, 1 visit(s) today
