বিশেষ প্রতিবেদন
কোটা বাতিলের দাবিতে জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ সংঘটিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যলায়ের শিক্ষার্থীদের দৃশ্যমান অংশগ্রহন পরিলক্ষিত হয়েছে। যদিও ছাত্র-রাজনীতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ বাংলাদেশে সবসময় খুবই সীমিত ছিল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।
আন্দোলন চলমান থাকাকালীন গতবছরের ১৬ই জুলাই কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ হতে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়। একইসাথে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদেরও এর পক্ষে থাকার আহ্বান জানানো হয়। ফলে আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সুরাহার সুযোগ তৈরি হয় এবং আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ হ্রাস পায়।
কিন্তু ১৮ই জুলাই হতে আন্দোলনকে পুনরায় চাঙ্গা করার জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সূত্র জানাচ্ছে, ব্র্যাক কর্তৃপক্ষের সরাসরি নির্দেশনা এবং সার্বিক সহায়তায় এটি শুরু হয়।
১৬ই জুলাই এই অবরোধ কর্মসূচি চলাকালীন সময় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. ডেভিড ডাউল্যান্ড। এসময় তাদের দাবির সাথে সংহতি প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, আমি তোমাদের দাবি আদায়ের কর্মসূচির বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করছি। তবে তোমরা নিরাপদে থেকো।
সুত্রঃ আন্দোলনে এসে ব্র্যাকের রেজিস্ট্রার বললেন— আক্রমণ হলে মেইন গেট খুলে দেবো
তিনি আরও বলেন, “এই কর্মসূচিতে কোনো ধরনের আক্রমণ হলে আমি প্রধান ফটক খুলে দেবো। বাকিটা আমাদের নিরাপত্তা কর্মীরা দেখবে, তোমরা চিন্তা কোরো না।”
আন্দোলনে থাকা একাধিক শিক্ষার্থী বিষয়টি পরে নিশ্চিত করেছেন।
১৭ই জুলাই ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী আসিফ সালেহ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং ছাত্র প্রতিনিধিদের সাথে একটি ভার্চুয়াল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেন। মিটিংয়ে তিনি সরাসরি আন্দোলন চালু রাখার ব্যাপারে নির্দেশনা প্রদান করেন এবং শিক্ষকদের সর্বোতভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার নির্দেশ প্রদান করেন।
মিটিংয়ে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, আসিফ সালেহ উক্ত মিটিংয়ে উল্লেখ করেন, ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন এবং ইএসএআইডি-এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে তার একাধিক বৈঠক হয়েছে। সেখান থেকে আন্দোলন চালু রাখার ব্যাপারে তিনি নির্দেশনা পেয়েছেন।
এই উৎসাহ আর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে, পরিকল্পিতভাবে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি প্রশাসন ১৮ই জুলাই ছাত্রদের রাস্তায় নামতে উস্কে দেন।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, কোটা সংস্কারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দেশজুড়ে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচিতে মেরুল বাড্ডা সড়কে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেয় এবং তাদের দেখাদেখি আশপাশের একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাস্তায় নেমে আসে এবং ১৮ই জুলাই সারাদিন রামপুরা থেকে বীর উত্তম রফিকুল ইসলাম সরণী হয়ে প্রগতি সরণী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে ছাত্র-জনতার অবস্থান আর পুলিশের ওপর আক্রমণ, যা দ্রুতই “প্রতিবাদ কর্মসূচি” থেকে আয়ত্ত্বের বাইরে চলে যায়।
উল্লেখ্য, ব্র্যাক দীর্ঘদিন ধরেই ইএসএআইডির সাথে কাজ করছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এ পর্যন্ত ইএসএআইডি হতে প্রায় ৩৪ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই অর্থ ছাড় হয়েছে ১৮ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২০০ কোটি টাকা)। শাসন, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং সততা প্রচার নামে PROGOTI প্রোগ্রামের মাধ্যমে ২০১২ সাল থেকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউএসএআইডি সরাসরি কাজ করা শুরু করে।
তারপর থেকে এখন পর্যন্ত শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসনসহ একাধিক প্রকল্প ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যমে বাস্তবায়ন করে ইএসএআইডি। ট্রাম্প প্রসাশন ইউএসএআইডি’র প্রকল্পগুলোকে ইতিমধ্যে অপরাধমূলক সংগঠন (Criminal Organization) হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং বলা হয়েছে এই সকল প্রকল্পে অর্থায়েনের মাধ্যমে ইউএসএআইডি কোনো দেশকে অস্থিতিশীল করে ক্ষমতার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত করেছে।
বিস্তারিতঃ শেখ হাসিনার সরকার হটাতে মার্কিন নীলনকশার গোপন নথি ফাঁস
এছাড়াও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ২০২০ সালে আমেরিকার সরোস ফাউন্ডেশনের ১ বিলিয়ন ডলারের ফান্ড গ্রান্ট প্রাপ্তি নিশ্চিত করে। যদিও প্রথমে এই গ্রান্টের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৫০০ মিলিয়ন ডলার, কিন্তু ব্র্যাক বিশবিদ্যালয়ের সম্ভাব্যতা দেখে জর্জ সরোস দাভোসে ২০২০ সালের WEF এর প্রথম সাক্ষাতেই এতোই মুগ্ধ হন যে, এই গ্রান্ট দ্বিগুণ করে ১ বিলিয়ন ডলার করে দেন।

“Open Society University Network (OSUN)” এর অংশ হিসেবে ব্র্যাক এই গ্রান্টপ্রাপ্ত হয়। যার মূল শর্ত ছিল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত সমাজের মূল্যবোধ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিশ্বাসের বৈচিত্র্যতা, একাডেমিক স্বাধীনতা প্রচার, নাগরিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও প্রচার করবে।

জর্জ সরোসের OSF এর মাধ্যমে কৌশলগত অংশীদার হিসাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন করে থাকে, যার বিনিময়ে উক্ত প্রতিষ্ঠান সরোস-এর ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদনঃ
সোরোস-ইউনূস বৈঠক: মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ডের পর বাংলাদেশে সফল মিশন
একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ১৮ই জুলাইয়ের আন্দোলনস্থল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হলেও এতে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও অংশগ্রহণ ছিলো। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে বক্তব্য প্রদান করেন। স্থগিত করা হয় ক্লাস পরীক্ষাও। আন্দোলনের অন্যতম ভূমিকা পালনকারী গণঅধিকার পরিষদের যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক সম্প্রতি এক কর্মসূচীতে দাবি করেন, তারা ভুয়া আইডি কার্ড বিলিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে আন্দোলনে অংশ নেন।
অনেকে এও বলে থাকেন, ৫ই আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পরে “বাংলাদেশ ২.০” ক্যাম্পেইনটা এসেছে ব্র্যাকের প্রাক্তন ভিসি প্রফেসর ভিনসেন্ট চ্যাং-এর “BU 2.0” কনসেপ্ট থেকে।

বিশ্বব্যাপী মার্কিন অর্থায়নে ডিপ স্টেট-এর প্রভাব বিস্তার আর সরকার পরিবর্তনের যে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হয়, তার পুরাটাই হয় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেনেও একইভাবে বিদেশি শক্তি অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে অর্থায়নের মাধ্যমে। সেই একই ধারায় উক্ত “ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন” সমূহ থেকে অনুদান নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় “সরকার পরিবর্তন” এর প্রভাবক হিসাবে কাজ করেছে কি না তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তদন্তের দাবিদার।
