অর্থনীতি
জুলাই-আগস্টের সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রতিহিংসাবশত দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগ্রুপ বেক্সিমকোর অনেক কারখানায় হামলা, ভাঙচুর হয়। এরপর ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তারের পর গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনে স্থবিরতা দেখা দেয়। ফলে বকেয়া বেতনের দাবিতে সৃষ্ট শ্রমিক অসন্তোষের সমাধান হিসেবে গ্রুপের ৩২টি কোম্পানির স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা করছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
কারখানা ভাঙচুর, মালিকপক্ষের লোকজনকে গণগ্রেপ্তারসহ পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে আগস্ট থেকেই বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই অচলাবস্থা দেখা দেয়। যার ফলে কর্মীদের বেতন দিতে পারছে না বেক্সিমকো। যে কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম ও ব্যবসা পরিস্থিতি পর্যালোচনাপূর্বক সুপারিশ করতে সরকার উপদেষ্টা পরিষদের একটি কমিটি গঠন করেছে। গত ২৮শে নভেম্বর কমিটির প্রথম বৈঠকে এই বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়।
নৌপরিবহন ও শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা শ্রমিকদের বকেয়া দ্রুত পরিশোধের জন্য আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করেন, অর্থ সংকুলানে ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেক্সিমকোর কিছু কোম্পানি বিক্রি করে দেওয়ার পরামর্শ দেন। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সুপারিশকে সমর্থন করেন এম সাখাওয়াত হোসেন।
সভায় বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ, বি ও সি—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করার বিষয়ে আলোচনা হয়। এই শ্রেণিবিভাজনের প্রস্তাব দেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। তার প্রস্তাবের ভিত্তিতে বেক্সিমকো গ্রুপের বিষয়ে উপদেষ্টা কমিটির প্রথম সভায় চারটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছ- প্রথমত, বেক্সিমকোর প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিকদের ৩ মাসের বেতন-ভাতার প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দেবে জনতা ব্যাংক। দ্বিতীয়ত, ‘বি’ শ্রেণির কোম্পানিগুলোর স্বত্ব বিক্রির জন্য ইওআই চূড়ান্ত করে ঋণদাতা জনতা ব্যাংক আগামী ৯ই ডিসেম্বরের মধ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে জানাবে। তৃতীয়ত, হাইকোর্টে চলমান রিটের জবাব তৈরির জন্য একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ করে প্রশাসকের কার্যপরিধি চূড়ান্ত করা। আইনজীবী নিয়োগের প্রয়োজনীয় খরচ দেবে অর্থ বিভাগ। চতুর্থত, এক সপ্তাহের মধ্যে বেক্সিমকোর কোম্পানিগুলোর শেয়ার হস্তান্তরের নিয়ন্ত্রণ নেবে কর্তৃপক্ষ, যা বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে বিএসইসি ও বেক্সিমকোর প্রশাসকের হাতে।
সরকার পক্ষের দাবি, ছোট-বড় মিলে বেক্সিমকো গ্রুপের অধীনে ১৬৯টি কোম্পানি রয়েছে। যদিও এই ১৬৯টি কোম্পানির তালিকা পাওয়া যায়নি।
বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর কাছে ১৬৯টি কোম্পানির তালিকা, কোম্পানিগুলো কেউ কিনতে না চাইলে পরিণতি, বন্ধ না করে সমধানের বিকল্প উপায় সন্ধান, তিন মাসের বেতন পরিশোধের পর বেকার হওয়া লক্ষাধিক শ্রমিকের ভবিষ্যৎ ইত্যাদি বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তিনি এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এর আগে গত ১৯শে সেপ্টেম্বর, বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা এবং গ্রুপের সব সম্পত্তি সংযুক্ত (অ্যাটাচ) করতে ‘রিসিভার’ নিয়োগ করার আদেশ দেন হাইকোর্ট। এই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. রুহুল আমিনকে রিসিভার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বেক্সিমকো গ্রুপের জন্য সহকারী রিসিভার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন- ড. সুমন্ত সাহা, সিএফএ অতিরিক্ত পরিচালক; মো. নাহিম উদ্দিন, সিএফএ, যুগ্ম পরিচালক এবং মো. আতিউর রহমান, উপ-পরিচালক।
উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে জনতা ব্যাংককে ৯ই ডিসেম্বরের মধ্যে বেক্সিমকোর ‘বি’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলো বিক্রির জন্য একটি এক্সপ্রেশন অফ ইন্টারেস্ট (ইওআই) চূড়ান্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) মন্ত্রণালয়ের কাছে এবিষয়ে অগ্রগতি সম্পর্কে সাপ্তাহিক আপডেট জানাবে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান বলেন, বেক্সিমকোর শ্রমিক-কর্মচারীদের তিন মাসের বেতন-ভাতা ও মজুরি বাবদ পরিশোধ করতে হবে ১৮০ কোটি টাকা। ব্যাংকের পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৯ই ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারকে জানাব। আর বি শ্রেণির কোম্পানিগুলোর জন্যও প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করব বিডাকে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর প্রস্তাবিত শ্রেণিবিভাজন অনুসারে, লাভজনক হওয়ায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসকে ‘এ’ শেণিতে রাখা হয়। ১৬টি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানাসহ বর্তমানে বেক্সিমকো গ্রুপের যে ৩২টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলছে, সেগুলোকে ‘বি’ শ্রেণিতে এবং বাকি ১৩৬টি কোম্পানিকে ‘সি’ শ্রেণিতে রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু আশিক চৌধুরীর কাছে ১৬৯টি কোম্পানির পূর্ণাঙ্গ তালিকা চাওয়া হলে তিনি তা দিতে পারেননি। প্রশ্নটি এড়িয়ে যান।
‘বি’ শ্রেণির কোম্পানিগুলোর স্বত্ব জনতা ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের মাধ্যমে এক্সপ্রেশন অফ ইন্টারেস্ট জারি করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির প্রস্তাব দেন আশিক চৌধুরী। শ্রমিক-কর্মচারীদের তিন মাসের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধপূর্বক ‘সি’ শ্রেণির কোম্পানিগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি। দরকারি তহবিল প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয় জনতা ব্যাংককে। সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে বিডা ও শ্রম মন্ত্রণালয়।
তিন মাস পর এই লক্ষাধিক বেকার শ্রমিক-কর্মচারীর ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়েও কোনো মন্তব্য করেননি আশিক চৌধুরী।
উপদেষ্টা কমিটির এসব সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে বেক্সিমকো গ্রুপের পরিচালক (অর্থ ও করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) ওসমান কায়সার চৌধুরী বলেন, ২৮শে নভেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠক উপলক্ষে মন্ত্রণালয় আমাদের ডাকলেও বৈঠকে রাখেনি। সিদ্ধান্তের কোনো চিঠিও পাইনি। ফলে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।
বেক্সিমকো গ্রুপ নিয়ে উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমসচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান জানান, বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না।
‘বি’ শ্রেণির কোম্পানিগুলোর স্বত্ব বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছেন, কেউ কিনতে না চাইলে কী হবে— এমন প্রশ্নের জবাবে শ্রমসচিব বলেন, একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে চেষ্টা করি, দেখিই না কী করা যায়। পোশাক খাতের কারখানাগুলো চালানোর জন্য আগে বিদেশি ক্রেতাদের আহ্বান জানানো হবে। আর কিছু কোম্পানিতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়ে পরিচালনার ব্যবস্থা করবে বিএসইসি।
এদিকে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি কনসোর্টিয়াম অক্টোবরে বেক্সিমকো ফার্মা ও বেক্সিমকো’র অধীনস্ত লাভজনক ৪টি কোম্পানি অধিগ্রহণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছে। দুবাই-ভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আদসুম ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট এই কনসোর্টিয়ামের পক্ষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদকে এই প্রস্তাবনার চিঠি দেয়।
অধিগ্রহণের প্রস্তাবে উল্লেখ করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো– বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, তিস্তা সোলার, বেক্সিমকো কমিউনিকেশন্স (স্যাটেলাইন অ্যান্ড ডিটিএইচ লাইসেন্স) এবং বেক্সিমকো লিমিটেড (টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক বিভাগ)।
বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তালিকাভুক্ত রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপের চারটি কোম্পানি– বেক্সিমকো ফার্মা, বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো সিন্থেটিক্স এবং শাইনপুকুর সিরামিকস। বেক্সিমকো ফার্মা লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জেরও তালিকাভুক্ত।
