– যাযাবর পথিক
গতবছর নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের জনগনের নায্য লড়াইয়ের স্বার্থে ফ্যাসিস্ট সরকারকে উৎখাত করে সরাসরি বিএনপিকে ক্ষমতায় বসাতে মতামত ব্যাক্ত করেছিলেন ২০১৭ সালে নিজের অপহারন নাটক সাজাতে গিয়ে ব্যার্থ হওয়া ফরহাদ মজাহার, যাকে লুঙ্গি দিয়ে মুখ ঢেকে খুলনার সীমান্ত দিয়ে পলায়নরত অবস্থায় বাস থেকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।
সত্তরের দশকে নকশালপন্থি, সিরাজ শিকদারের সহযোদ্ধা ফরহাদ মজহার এক দশক আমেরিকায় স্বচ্ছায় নির্বাসনে থাকার পরে দেশে ফিরে মাওবাদী দলগুলোকে এক করার উদ্দেশ্যে গঠন করেছিলেন “ঐক্য প্রক্রিয়া” সমাজতান্ত্রিক আদর্শের মোহভঙ্গ ঘটে উনার সেসময়েই। উনি বুঝে গিয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক দল ও ব্যাক্তির ঐক্য হওয়া বাস্তবিক অর্থে সম্ভব না।
নিকট অতীতে যুদ্ধপরাধীদের বিচারে যখন লাখো কোটি বাঙালি ঐক্যের সৃষ্টি করে গণজাগরনের নামে, তখন বিরুদ্ধপথে হাটেন তিনি। বাংলাদেশের ধর্মীয় মৌলবাদের বিস্তাররোধে যে মূহুর্তে খুব জরুরী ভূমিকা গ্রহন করা উচিত- ফরহাদ মজহার তখন ‘মাদ্রাসার এতিম ছাত্রদের’ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন মার্কিন আগ্রাসন প্রতিরোধ করার। আর এরই সূত্রধরে, যে ব্যক্তি নারী মুক্তির জন্য উবিনিগ, প্রবর্তনা, নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা’র মতো প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছেন- তিনি সম্পদে নারীর সমধিকার দানকে উস্কানীমূলক বলে প্রচার করেন। বেশ কিছুদিন ধরে চালবাজ কাঠমোল্লাদের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে ইসলামী শাসন কায়েমের স্বপ্নও বুনছেন ফরহাদ মজহার। হেফাজতে ইসলামীর তাত্ত্বিক গুরু হয়ে ওঠা ফরহাদ মজাহার ‘এবাদতনামা’ র উল্টরথে যাত্রা সেই শুরু।
ফরহাদ মজহার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতার নামে সমাজতান্ত্রিক কোন শক্ত জোট বা জনবল না পেয়ে মৌলবাদকে ধারন করেছেন, মৌলবাদকে উৎসাহিত করছেন এবং মৌলবাদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন প্রচার মাধ্যমে, কারন বিগত দিনে এই লেবাসপন্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং তারা খুব সহজেই ইউনিটি অব কমান্ড মেনে চলে, কোন প্রশ্ন বা যাচাইবাছাই করে না। তাত্ত্বিক ভাবে বাম ঘরনার নিজেদের সংখ্যাটা বড় করার বদলে উনি বেছে নিয়েছেন “সংখ্যাগুরু” দের প্রভাবিত করে স্বীয় স্বার্থে ব্যাবহারের ত্বরিকা, অনেকটা উনার দৃষ্টিতে সম্রাজ্যবাদী মার্কিনিদের কোন বিশেষ সংগঠনের মতোন।
শুধু তাই নয়, তিনি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন, যে সকল ব্যক্তি বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী তারা বুশ-ব্রাউনের এজেণ্ট। বাংলাদেশের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক চেহারা, আর্থ-সামাজিক আচার, আর ধর্মীয় চেতনা আর যাই হোক পাশ্চাত্য থেকে আমদানী হয়নি। ফরহাদ মজহার আজ যাদের সাপ বলে অভিহিত করতে চাইছেন, তারাই তাঁর এককালের ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ বিনির্মানের সহযোদ্ধা ছিলেন। ইউরোপের চার্চ থেকে পৃথক হওয়া রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাকে ফরহাদ মজহার ঐতিহাসিক বিবেচনায় সমর্থন করলেও- বাংলাদেশে আসন্ন ইসলামী বিপ্লবের অনিবার্যতাকে তিনি এড়াতে পারেন নাই। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতাকে কিছুটা ঘুরিয়ে ফ্যাসিবাদ বলে ভাবেন এবং মনে করেন, বাংলাদেশে ইসলামের যুদ্ধটা এই ফ্যাসিবাদ আর পরাশক্তির সমর্থকদের সাথেই ঘটবে। বাম মতাদর্শকে আজ তিনি পচনশীল মনে করছেন এবং কাল্পনিক প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করে ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছেন সেটি তাঁর অসংখ্য চিন্তার বৈপরিত্যের নমুনামাত্র।
নিজ উদ্দেশ্য চিরতার্থ করতে এক সময় ধর্মের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লেখনির মাধ্যমে দাঁড়িয়েছেন যেই ফরহাদ মজহার, সেই ফরহাদ মজহারের ধর্মীয় অন্ধত্বকে পুজি করে সেটাকে লড়াইয়ের অস্ত্র হিসাবে ধারন করতেও পিছপা হননি। যেমন পিছপা হননি দীর্ঘদিনের সঙ্গি ফরিদা আখতারের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে শিষ্য অর্চনার সাথে গোপন এবং অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে।
হেফাজতি ইসলামীর কোমলমতি এবং দিশাহীন কিশোর তরুন এবং অন্ধ নেতাদের স্বীয় স্বার্থে প্ররোচিত করার যুদ্ধটা দীর্ঘায়িত হওয়ায় ফরহাদ মজাহার নিজের অন্তর্ধানের নাটক রচনা করেন ২০১৭ সালে। সেটাও ভেস্তে যায় পীনাকি ভট্টাচার্যদের অতিরিক্ত বদন্যতায় আর প্রচারনায়। এরপরে দীর্ঘদিন পাদপ্রদীপ থেকে দূরে থাকেন তিনি। ২০২১/২২ সালে আবার সরব হতে শুরু করেই “ইনসাফ কমিটি” গঠন করে বাম ও ইসলাম এর মিলিত এক ঘরনা, বামাত জন্ম দেয়ার চেষ্টা করেন ফরহাদ মাজহার, বাম থেকে ডানে প্রবর্তনের দ্বিতীয় অধ্যায় এটা। ডান আর বামের মাঝামাঝি একটা গ্রে এরিয়া সৃষ্টির চেষ্টা, যাকে তিনি কাল্পনিক সম্রাজ্যবাদ আর ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে দাড় করাতে চাচ্ছিলেন। “দুনিয়ার মজদুর এক হও” স্লোগান হয়ে যায় আরবী উচ্চারনে “ফুক্কে কুল্লে নেযামিন”, নিপীড়িত জনতা হয়ে যায় “মজলুম”, ন্যায় হয়ে যায় “ইনসাফ”, এভাবেই সমাজতন্ত্রকে বিবর্তিত করে ইসলামিক বিপ্লবের স্বপ্নের ২য় পর্ব দেখা শুরু করেন ফরহাদ মাজহার।
কিন্তু এই স্বপ্নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় আওয়ামিলীগ, কারন ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রতি আওয়ামিলীগের সহনশীলতা এবং নমনীয়তা। ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামীলিগকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়ে উনি এমন কিছু মুক্তিযুদ্ধ বিরোধি দল বা মতের পক্ষে কলম ধরেছেন যাদের বিরুদ্ধে তরুন বয়সে সিরাজ শিকদারের সাথে মিলে সর্বহারাদের পক্ষে সশস্ত্র বিপ্লব করছেন।
প্রতি দশকে নিজের রঙ রুপ বদলানো ফরহাদ মাজহার হয়তো বাংলাদেশের সর্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ইতিহাসের জন্য বড় কোন হুমকি হয়ে উঠবেন না মনে করা হয়েছিল, কিন্তু আমার ব্যাক্তিগত ধারনা, উনি হুমকি তাদের জন্য যাদের পক্ষে উনি কলম ধরেন। প্ররোচিত আর প্রভাবিত করার এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছের উনার লেখনিতে, এবং উনি একটা উল্লেখযোগ্য সংখক তরুনকে প্রভাবিত করে আসছেন যুগে যুগে। সেটাও সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে উনার অবস্থান পরিবর্তন এবং বৈপরীত্য। অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে উনি উনার ভক্ত আর শিষ্যকুলকে অবিন্যস্ত আদর্শ আর ভ্রান্ত রাজনৈতিক দর্শনের এমন একটা অবস্থায় ছেড়ে যান, যেখান থেকে তাদের ফেরার আর কোন উপায় থাকবে না। এলোমেলো বিচ্ছিন্ন নেতৃত্বহীন তারা পরবর্তিতে হয় উগ্রবাদী হয়ে ওঠে নয়তো রাজনীতিবিমুখতা পেয়ে বসে তাদের।
রাজনীতিতে এতোটুকুই ফরহাদ মাজহারের অবদান ছিল এতোদিন, মানে ২০২৪ পর্যন্ত।
অবশেষে তিনি ভাবশিষ্যদের নিয়ে একটা অভ্যুত্থান ঘটাতে সফল হয়েছেন বলা চলে। সফলতা এই অর্থে যে, উনি সরকারকে গদিচ্যুত করে ভাবশিষ্যদের ক্ষমতায় বসাতে অনেক কুশিলবের একজন হিসাবে সফল হয়েছেন। বিগত কিছু বছর উনার পাঠচক্র আবর্তিত ছিল যাদের নিয়ে তাদের প্রায় বেশিভাগই ইউনিটি অব কমান্ড মেনে চলা মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত। উনি বর্তমানের অনেক সমন্ব্যকদের গড়েছেন নিজের দ্বিচারি চিন্তা ভাবনার আদলে। প্রথম থেকেই উনার বাধ্য সৈন্য দরকার ছিল, যৌক্তিক চিন্তা করার মতো মেধা না। এবং এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায় সমন্বয়কদের বক্তব্যে। তারা এমন ভারী ভারী শব্দ ব্যাবহার করেন, যা ধারন করার মতো অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান কনোটাই তাদের হয়ে ওঠেনি, গ্রন্থগত বিদ্যার তোতাপাখির বুলি।
তারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে ইনক্লুসিভনেস এর কথা বলে, অথচ তাদের সভা সেমিনারে নারী বা ভিন্ন ধর্মের কারো অবস্থান নগন্য, তারা বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসকে অস্বিকার করে বলে পাকিস্থানের ধর্ম থেকে বাংলাদেশের ধর্ম আলাদা করতেই মুক্তিযুদ্ধ হয়, তারা বঙ্গবন্ধু সহ চার নেতাকে অস্বিকার করে। তারা যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলকে পশ্চিম পাকিস্থানের মন্ত্রী হিসাবে ইনক্লুসিভনেস এর উদাহারন দেয়, অথচ জানেনা যোগেন্দ্রনাথ পশ্চিম পাকিস্থানে প্রতিকূলতার মুখে মন্ত্রীত্ব ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা একে নিষিদ্ধ করে, উমুক দলকে নিষিদ্ধের জন্য রিট করে, মব লিঞ্চিং করেন, মবোক্রেসি কায়েম করে, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে চায় ক্যাম্পাসে, আবার নিজেদের দলের জন্য জনমতের সভা করে সেই একই ক্যাম্পাসে। মানে তারা টোটাল লস্ট, কি করবে না করবে বুঝতে না পারা কিছু ভাবশিষ্য, ঠিক তাদের গুরু ফরহাদ মাজহারের মতোই।
এর পর কি হবে/করবে, গুরুর মতোই তাদের কোন প্ল্যান নাই, ভিশন নাই বা কোন ধারনাই নাই, আছে শুধু গালভরা বুলি।
সর্বশেষে দুটি চরনে ফরহাদ মাজহারকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি,
