সড়কে একদিনে ৬৬ প্রাণহানি ও ১০৪ জন স্থায়ী প্রতিবন্ধী: নিষ্ক্রিয় ২৪ ট্রমা সেন্টার

সড়কে একদিনে ৬৬ প্রাণহানি ও ১০৪ জন স্থায়ী প্রতিবন্ধী: নিষ্ক্রিয় ২৪ ট্রমা সেন্টার
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৬৬ জনের প্রাণহানি ঘটছে। এ হিসাবে বছরে মারা যাচ্ছেন ২৪ হাজার ২৩৩ জন। প্রাণহানির পাশাপাশি প্রতিদিন গড়ে ১০৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায় স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছেন।

অথচ আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে ২৪টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

কিন্তু চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবলের সংকটে এসব কেন্দ্রের অধিকাংশই কার্যকর নয়। ফলে দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না আহতরা।

১৭ই অক্টোবর ছিল বিশ্ব ট্রমা দিবস। দুর্ঘটনা ও আঘাতে আক্রান্ত মানুষের জীবন রক্ষা, জরুরি চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতেই দিবসটি পালিত হয়।

তবে দেশে আঘাতজনিত মৃত্যু ও প্রতিবন্ধিতার বাস্তবতার সঙ্গে জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থার প্রস্তুতি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা জরিপ ২০২২-২৩’ বলছে, দুর্ঘটনা ও আঘাতজনিত কারণে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৯৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, পানিতে ডোবা ও পড়ে যাওয়া—এই চারটি কারণে প্রতিদিন গড়ে ২১১ জন মারা যান। মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার পর আত্মহত্যার অবস্থান দ্বিতীয়; এতে বছরে ২০ হাজার ৫০৫ জনের মৃত্যু হয়।

পানিতে ডুবে মারা যান ১৮ হাজার ২৬৮ জন, আর পড়ে গিয়ে প্রাণ হারান ১৪ হাজার ২৬৮ জন।

২০২৪ সালে প্রকাশিত জরিপটি যৌথভাবে পরিচালনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এবং সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)।

তথ্য সংগ্রহের জন্য দেশের ৬৪ জেলার শহর ও গ্রামের এক লাখ ১০ হাজার পরিবারের চার লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ সদস্যের সঙ্গে কথা বলা হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১০টি এবং ২০১০ সালে আরও ১৪টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব অবকাঠামো নির্মাণে অন্তত ১৪০ কোটি টাকা খরচের তথ্যও এসেছে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত না করায় অধিকাংশ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই কার্যক্রমের বাইরে ছিল।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, ট্রমা সেন্টারগুলো চালু না থাকায় দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দূরের হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘গোল্ডেন আওয়ার’ পার হয়ে যায়। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেকে হাত-পা হারিয়ে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। পাশাপাশি রাজধানীর কেন্দ্রীয় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বাড়ছে।

জরিপের হিসাবে, দুর্ঘটনা ও আঘাতে দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪৫ হাজার ৪০৮ জন আহত হন। একই সময়ে গড়ে ৩৮০ জন স্থায়ী প্রতিবন্ধিতার শিকার হন। তাদের মধ্যে পড়ে গিয়ে প্রতিদিন ১৫৯ জন এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ১০৪ জন স্থায়ী প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছেন।

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর ড. শরিফুল আলম বলেন, সড়কে পথচারীদের নিরাপত্তা বাড়াতে অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান শনাক্ত করে সেগুলো নিরাপদ করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা ঠেকানোর উদ্যোগের পাশাপাশি ট্রমা সেন্টারগুলোতে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ, জরুরি রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থা এবং বড় হাসপাতালগুলোর সঙ্গে সমন্বিত চিকিৎসাপদ্ধতি গড়ে তোলা জরুরি।

Visited 2 times, 1 visit(s) today