❐ আয়নাল কারিগর
মার্কিন চুক্তির মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত ২.৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে মেধাস্বত্বের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি মেধাস্বত্বের অধিকার প্রয়োগে কার্যকর দেওয়ানি, ফৌজদারি ও সীমান্তভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে অধিকার লঙ্ঘন বা অপব্যবহার ঠেকানো যায়।
অর্থাৎ, চুক্তিটি মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন এবং পেটেন্ট আইন জোরালোভাবে প্রয়োগের কথা বলছে।
দেশের ওষুধশিল্পের সঙ্গে মেধাস্বত্ব আইনের সম্পর্ক জটিল। বাংলাদেশে তৈরি জেনেরিক ওষুধের প্রায় ৯০ শতাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আসে, যদিও বেশির ভাগ কাঁচামালের পেটেন্ট নেই। এত বিপুল সংখ্যক উপাদানের মধ্যে কোনটির আইপি লাইসেন্স আছে, কোনটির নেই, কিংবা কোনো পেটেন্ট লঙ্ঘন হয়েছে কি না—তা নির্ধারণ কীভাবে হবে?
এই কাজের দায়িত্ব কার, আর তা বাস্তবায়নই বা করবে কে? বন্দর কর্তৃপক্ষ বা কাস্টমসের দায়িত্বের মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া পড়ে না। তাহলে কাজটি কারা করবে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বিদেশি কোম্পানির মেধাস্বত্ব আমদানি করা কাঁচামাল বা পণ্যের মাধ্যমে লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, তা শনাক্ত করতে বাংলাদেশের কাস্টমসকে সক্ষম করার জন্য বেশ কিছুদিন ধরেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
চুক্তির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, কাস্টমসের ডিজিটাল তথ্য পাওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অতি আগ্রহ! এর সঙ্গে মেধাস্বত্ব আইনের ‘ডিজিটাল এনফোর্সমেন্ট’ ব্যবস্থাও যুক্ত।
বন্দর ও কাস্টমসের তথ্য হাতে পেলে বিদেশি পক্ষ উৎপাদকদের আমদানি করা কাঁচামালের লেবেল অনুসরণ করতে পারবে। এর ফলে প্রযুক্তিগত নজরদারির কাজে জাপানি পক্ষ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে মার্কিন পক্ষ এবং বাণিজ্যিক স্বার্থে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সুবিধা পাবে; অন্যদিকে বাংলাদেশের কাস্টমসকে দেশের উৎপাদকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
মেধাস্বত্ব আইন কেবল প্রশাসনিক বা কাস্টমস-সংক্রান্ত বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক প্রশ্নও। ‘গ্লোবাল সাউথ’ ও ‘গ্লোবাল নর্থ’-এর মধ্যে এ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। কোনো পণ্য বা ওষুধের মেধাস্বত্ব প্রয়োগ করা হবে কি না, কোথায় হবে এবং কতটা কঠোরভাবে হবে—এসব সিদ্ধান্ত দরিদ্র দেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও স্থানীয় শিল্পের টিকে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত।
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির ওষুধ সংক্রান্ত ধারাগুলো বাংলাদেশের ওষুধ-শিল্পের জন্য যে ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে
- পেটেন্ট ফি ও লাইসেন্সের খরচ বাড়বে: এলডিসি হিসেবে পাওয়া ছাড় সীমিত বা বাতিল হলে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট ওষুধের কাঁচামাল বা উপাদানের পেটেন্ট ফি ও লাইসেন্সের জন্য অর্থ দিতে হতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।
- সস্তায় জেনেরিক ওষুধ তৈরি কঠিন হবে: বাংলাদেশের ওষুধশিল্প এলডিসি-সুবিধার আওতায় পেটেন্ট ছাড় নিয়ে জেনেরিক ওষুধ তৈরি করে বিকশিত হয়েছে। কঠোর মেধাস্বত্ব প্রয়োগ এই উৎপাদন মডেলকে চাপে ফেলতে পারে।
- ছোট ওষুধ কোম্পানিগুলো টিকে থাকার সংকটে পড়তে পারে: দেশে ১৮২টি কোম্পানির বেশির ভাগের পক্ষে বাড়তি পেটেন্ট ফি দেওয়া কঠিন হলে বাজার থেকে সরে যেতে হতে পারে। ফলে বাধ্য হবে ওষুধের দাম বাড়াতে।
- শিল্পে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে: ছোট কোম্পানিগুলো দুর্বল হলে বাজারের বড় অংশ হাতে গোনা কয়েকটি বড় বা বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
- কিছু ওষুধের দাম বাড়তে পারে: গবেষণা অনুযায়ী, পেটেন্ট ফি দিতে হলে দেশে উৎপাদিত ইনসুলিনের দাম ১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কেমোথেরাপি, ক্যানসার ও হেপাটাইটিস সি–র ওষুধের দামও বাড়ার আশঙ্কা উল্লেখ করা হয়েছে।
- জেনেরিক ওষুধের দাম ব্যাপকভাবে বাড়ার ঝুঁকি আছে: দুর্বল বাজার-নজরদারি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির অভাবে জেনেরিক ওষুধের দাম অনেক বেড়ে যেতে পারে—সর্বোচ্চ ১,০০০ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনার রয়েছে।
- ওষুধ দুষ্প্রাপ্য হতে পারে: পেটেন্ট-সংক্রান্ত বাধা বা বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের কারণে কিছু ওষুধ বাজারে কম পাওয়া যেতে পারে; এমনকি দাম বেশি দিয়েও তা সংগ্রহ করা কঠিন হতে পারে।
- রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে: ওষুধের দাম বাড়লে রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে চিকিৎসার জন্য আরও বেশি অর্থ দিতে হবে। ২০ টাকার জেনেরিক ওষুধের দাম ৫০০ টাকা হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখ করা হয়েছে।
- জনস্বাস্থ্য ও ওষুধে প্রবেশাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে: সুলভ ওষুধ কম পাওয়া বা নাগালের বাইরে চলে গেলে বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
- দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা চাপে পড়তে পারে: দেশীয় শিল্প দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ ওষুধের চাহিদা মেটায় এবং ১০০টি দেশে রপ্তানি করে। পেটেন্ট ব্যয় ও আইনি বাধা বাড়লে এই উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
- আমদানি ও কাস্টমস পর্যায়ে জটিলতা বাড়তে পারে: কোন কাঁচামালের পেটেন্ট আছে বা নেই, কিংবা কোনো আমদানিতে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে কি না—তা নির্ধারণ জটিল। কাস্টমসকে এ দায়িত্ব দেওয়া হলে ভুল শনাক্তকরণ, পণ্য আটকে যাওয়া বা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
- আইনি অনিশ্চয়তা ও মামলা বাড়তে পারে: পেটেন্ট নির্ধারণে দক্ষ জনবল ও আইনগত সক্ষমতার ঘাটতির রয়েছে বাংলাদেশে। সেই প্রস্তুতি ছাড়া কঠোর প্রয়োগ হলে দেশীয় কোম্পানিগুলো দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল আইনি লড়াইয়ে জড়াতে পারে।
- জাতীয় নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে: দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাধ্যবাধকতা এলডিসি-সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ ও ওষুধ খাতে জনস্বার্থভিত্তিক নীতি নেওয়ার স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে।
কাঁচামালের পেটেন্ট যাচাই আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কঠিন কাজ। এ-সংক্রান্ত অসংখ্য মামলা বছরের পর বছর নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকে। তাই পেটেন্ট নির্ধারণ বিচারিক বিষয়ও বটে। আফ্রিকায় এইডস ও যক্ষ্মার ওষুধের অভাবে বহু মানুষের মৃত্যুর পর ওষুধ উৎপাদনে পেটেন্ট আইনের কঠোর প্রয়োগের বিরুদ্ধে মহাদেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।
এত সংবেদনশীল ও বিতর্কিত বিষয়কে তাই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা দরকার। বিভিন্ন দেশে পেটেন্ট নিয়ে হওয়া আইনি লড়াইয়ের ইতিহাসও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চুক্তিতে সই করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকার মেধাস্বত্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক নিয়ে জরুরি আলোচনাকে সরিয়ে বিষয়টিকে কেবল আইনশৃঙ্খলা বা পুলিশি প্রয়োগের প্রশ্নে পরিণত করেছে।
এতে যেন বিদেশ থেকে নজরদারি চলবে, সচিবালয় থেকে সবাইকে ধরার নির্দেশ আসবে, আর কাস্টমস গ্রেপ্তারের কাজ করবে। অথচ প্রতিটি পেটেন্টের বিষয় আলাদা করে সতর্কভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।
বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিসের কারিগরি ও আইনগত দক্ষতার ঘাটতিও প্রণিধানযোগ্য। কোনো নতুন আবিষ্কারের পেটেন্ট কার প্রাপ্য, আর কার নয়—সেটি নির্ধারণে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বিচারিক বিবেচনা, আইনি প্রশিক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং জনস্বার্থ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন।
এসব সক্ষমতার অভাব রয়েছে বাংলাদেশে। এ ধরনের মামলা সামলানোর মতো দক্ষ আইনজীবীরও সংকট আছে। বিষয়টি শুধু কারিগরি নয়; এখানে জনস্বার্থের সঙ্গে ব্যবসায়িক মুনাফার দ্বন্দ্ব জড়িত—এই উপলব্ধিও যথেষ্ট নয়।
এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় দেশীয় ওষুধ কোম্পানির সম্ভাব্য মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন শনাক্ত করতে আমেরিকান বা জাপানি প্রশিক্ষণ পাওয়াকে ‘প্রযুক্তি হস্তান্তর’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে পেটেন্ট ও ট্রেডমার্কের বিরোধ মেটাতে দীর্ঘ আদালতি লড়াই চলে। প্রশ্ন, মার্কিন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ কি নিজের আদালতের সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিচ্ছে?
স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি হওয়ার একটি সুবিধা হলো, জেনেরিক ওষুধ তৈরির জন্য বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর পেটেন্ট ও লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। জেনেরিক ওষুধের উপাদান সাধারণত ব্র্যান্ডের ওষুধের উপাদানের মতোই থাকে।
সাধারণ নিয়মে মূল ব্র্যান্ডের ওষুধের পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হলে অন্য কোম্পানিগুলো একই ওষুধ তৈরি করতে পারে; সেটিই জেনেরিক ওষুধ।
এলডিসি হওয়ার কারণে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর পেটেন্ট ফি দিতে হয় না। মেধাস্বত্ব আইনের এই ছাড় কাজে লাগিয়ে দেশে শত শত ওষুধ কোম্পানি গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করে তুলনামূলক কম মুনাফায় ব্যবসা করা। ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখাও ওষুধনীতির উল্লেখযোগ্য অর্জন। স্থানীয় দোকান থেকে ৫০ টাকায় যে জেনেরিক ওষুধ পাওয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে তার দাম হয়তো শতগুণ বেশি।
দেশের ওষুধশিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ মেটায় এবং ১০০টির বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। এলডিসি হিসেবে পেটেন্ট আইনে পাওয়া ছাড় এই শিল্পের বিকাশে জরুরি ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে, অথবা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে আলাদাভাবে আইপি ফি দিতে বাধ্য হলে, শত শত দেশীয় কোম্পানির পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করে কম দামে ওষুধ তৈরি করা কঠিন হবে। মার্কিন চুক্তির শর্তে সেই দিকটিই স্পষ্ট।
দেশের ১৮২টি ওষুধ কোম্পানির অধিকাংশই ছোট প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত অনুযায়ী মেধাস্বত্ব আইন কঠোরভাবে কার্যকর হলে, এসব কোম্পানির পক্ষে পেটেন্ট ফি দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে।
তেমন পরিস্থিতিতে ২০ কোটি মানুষের ওষুধ সরবরাহের নিরাপত্তা হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানির—বিশেষত বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির—নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশে বহুল ব্যবহৃত অনেক ওষুধ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, কোনো ওষুধ তৈরির জন্য ‘সল্ট-১’ নামে একটি কাঁচামাল আমদানি করতে হয়—এমনটা ধরা যাক। এলডিসি-সুবিধার কারণে দেশীয় কোম্পানি এখন পর্যন্ত সেটি পেটেন্ট ফি ছাড়াই আমদানি করতে পারে। কিন্তু চুক্তি কার্যকর হলে, ওমিপ্রাজল উৎপাদনে ব্যবহৃত ওই লবণ বা তার কাছাকাছি কোনো উপাদান পেটেন্ট করা থাকলে কোম্পানিগুলোকে পেটেন্ট ফি দিতে হতে পারে।
নতুন ওষুধ, নতুন কাঁচামাল কিংবা পুরোনো কাঁচামালের নতুন সংস্করণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নানা পেটেন্টের বাধা অতিক্রম করে উৎপাদন করতে হলে দেশের ওষুধশিল্পের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এ কারণে বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোও বলছে, চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই। চুক্তির মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত প্রতিটি ধারাই পুরো ওষুধশিল্পের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
অনেক দেশ এখন পেটেন্ট-সংক্রান্ত জটিলতা সামলাতে সতর্কভাবে মেধাস্বত্ব আইন প্রয়োগ করছে। স্থানীয় ওষুধ উৎপাদনে তারা জনস্বার্থ, জনস্বাস্থ্য এবং মানুষের ওষুধ পাওয়ার অধিকারকে গুরুত্ব দেয়।
ব্রাজিল, মিসর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ জাতীয় স্বার্থকে বিবেচনায় রেখে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের পেটেন্ট অফিসের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ফলে তাদের পেটেন্ট অফিসগুলো জনস্বার্থ ও কোম্পানির স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখার দক্ষতা অর্জন করেছে।
ভারতীয় কোম্পানি নাটকো ‘রিসডিপ্লাম’ নামে একটি মেরুদণ্ডের ওষুধ তৈরি করতে চেয়েছিল। ওষুধটির মূল পেটেন্ট ছিল সুইস কোম্পানি রোশের হাতে। রোশ মামলা করে দাবি করে, ওষুধটি তৈরি করতে হলে ভারতীয় কোম্পানিকে রয়্যালটি দিতে হবে।
দীর্ঘদিন মামলা চলার পর ভারতীয় হাইকোর্ট নাটকোর পক্ষে রায় দেন এবং স্থানীয়ভাবে ওষুধটি উৎপাদনের অধিকার দেয়।
নাটকো জেনেরিক ওষুধটি তৈরি করার পর দেখা যায়, প্রতি বোতলের উৎপাদন খরচ ১৫ হাজার রুপি। অথচ একই ওষুধ রোশ বিক্রি করত ৬ লাখ রুপিতে। অর্থাৎ স্থানীয় উৎপাদনে দাম কমেছিল ৯৭ শতাংশ।
ভারতীয় আদালত বিদেশি কোম্পানির পেটেন্টের পক্ষে রায় দিলে জনগণ এত কম দামে ওষুধটি পেত না। এ রায়কে মেধাস্বত্ব আইনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়; এতে জনস্বার্থকে কোম্পানির স্বার্থের চেয়েও অধিক প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ—অর্থাৎ আনুমানিক দুই কোটি মানুষ—ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট রিভিউ’-এ প্রকাশিত চার গবেষকের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোকে পেটেন্ট ফি দিতে হলে দেশে উৎপাদিত ইনসুলিনের দাম সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ বাড়তে পারে।
কেমোথেরাপির ওষুধ, অনকোলজি বা ক্যানসারের ওষুধ এবং হেপাটাইটিস সি–র ওষুধের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এমনিতেই বাংলাদেশের বাজার তদারকি কাঠামো দুর্বল। বাজার নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি এবং প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রস্তুতির অভাবে জেনেরিক ওষুধের দাম ১,০০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। কিছু ওষুধের দাম বাড়ার পাশাপাশি সেগুলো দুষ্প্রাপ্যও হতে পারে—অর্থাৎ বেশি দাম দিয়েও পাওয়া নাও যেতে পারে।
বাংলাদেশে চিকিৎসার ব্যয়ের বড় অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের ব্যয়ের হার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। ২০ টাকার জেনেরিক ওষুধের দাম যদি ৫০০ টাকায় পৌঁছায়, তাহলে জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
মার্কিন চুক্তির ফলে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে পাওয়া সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। এলডিসি হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় বাংলাদেশ যেসব সুবিধা পায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাধ্যবাধকতা সেই সুবিধা এবং নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়ার শামিল।
এর সঙ্গে নতুন ১৫টি শর্তও যুক্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র শর্ত, নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপ করবে—এটিকে দেশটির পুরোনো নীতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় শিল্পগুলোর স্বার্থ নিজ উদ্যোগে বিসর্জন দেওয়ার পেছনে কারা ছিলেন? চুক্তির পক্ষে গোপনে বা প্রকাশ্যে কারা প্রচার চালিয়েছেন?
দেশীয় পোশাক, পোলট্রি, ডেইরি, ওষুধ ও কৃষি খাতের অর্জন ক্ষতিগ্রস্ত করে এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কারা পরিকল্পিতভাবে কাজ করেছেন—সেই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), অন্তর্বর্তী সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা—যিনি বর্তমানে মন্ত্রী—এবং ইআরডির পরামর্শক হিসেবে কাজ করা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চুক্তিটি করতে এত আগ্রহী ছিলেন কেন, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।
তাদের অনেকেই শেখ হাসিনা সরকারের সময়ও বাংলাদেশকে এলডিসি তালিকা থেকে বের করার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। বিষয়টি মনে রাখা দরকার।
শেখ হাসিনা সরকারের হিসাব ছিল ভিন্ন। জীবিকা, কর্মসংস্থান ও জনস্বাস্থ্যের মতো জরুরি বিষয়গুলো আমলে নিয়েও রাষ্ট্র মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে ছিল অর্থনৈতিক শক্তির ফলে। জিডিপি আদর্শ অবস্থানে ধরে রাখা, মানব উন্নয়ন সূচক, দারিদ্র বিমোচন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মতো সূচকে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ এক উদাহরণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ২০২৪-এর জুলাইর ধ্বংসযজ্ঞ দেশকে পিছিয়ে নিয়ে গেছে আরও ৫০ বছর।
জুলাই ধ্বংসযজ্ঞের পর দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে বিপুল হারে। উৎপাদন বন্ধ, দারিদ্র-উচ্চ বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেশকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের অনেকের মতে, এমন অবস্থায় মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলে স্থানীয় উৎপাদকেরা একের পর এক বাণিজ্যসুবিধা হারাতে পারেন।
কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের দেশে এলডিসি-সুবিধা ছেড়ে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাধ্যবাধকতা স্বেচ্ছায় মেনে নেওয়া জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত- এটি অনেকেই বুঝতে পারছেন এখন। এই অসম ও দেশবিরোধী চুক্তিতে যারা সম্পৃক্ত ছিল, তাদের কি জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হবে কখনো?
