বিশ্লেষণ।। দিল্লির গণআন্দোলন আর বাংলাদেশের জুলাই গণআন্দোলন-যেই যেই কারণে এক নয়

বিশ্লেষণ।। দিল্লির গণআন্দোলন আর বাংলাদেশের জুলাই গণআন্দোলন-যেই যেই কারণে এক নয়
শেয়ার করুন

দিল্লিতে সংবিধান রক্ষার আন্দোলন, ঢাকায় সংবিধান পরিবর্তন ও দায়মুক্তির 

– এ,এস,এম শরিফুল হাসান

ভারতের দিল্লিতে চলমান গণআন্দোলন এবং বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণআন্দোলনকে একই দৃষ্টিতে দেখা আর তুলনা করার একটা ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যেখানে বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ, তাদের মতোই দিল্লির গণআন্দোলনকে “মোদির’ সরকার পতন” এর আন্দোলন হিসাবে দেখছে।

দুটি আন্দোলনের লক্ষ্য, চরিত্র এবং সংবিধানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একটি আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য সংবিধান রক্ষা ও জনগণের কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠা; অন্যটির নেতৃত্বের লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা, সংবিধান পরিবর্তন, রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভিত্তি পুনর্নির্ধারণ এবং অতীতের কর্মকাণ্ডের দায়মুক্তি নিশ্চিত করার বিতর্কিত প্রচেষ্টা।

দিল্লির গণআন্দোলন এবং বাংলাদেশের জুলাই গণআন্দোলনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে আন্দোলনের প্রাথমিক দাবি, পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার ক্ষেত্রেও।

বিরোধী দলের রাজনৈতিক ফায়াদা হাসিলের সুযোগ

দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থাকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রাজনৈতিক ফায়দা লোটার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে না—বরং তাদের ঘোষিত মূল দাবির ওপরই জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা-ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনটি কোটা সংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে পৌঁছায়। এই রূপান্তরের পেছনে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে যুক্ত ও আন্দোলনকে সমর্থনকারী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা পরবর্তিতে পরিষ্কার হয়েছে। জামায়াত-শিবির থেকে শুরু করে বিএনপি-ছাত্রদল, সকলেই জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনকে পুজী করে আন্দোলনের গতিপথ বদলাতে ভূমিকা রেখেছে, ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেছে, এবং এগুলো সবকিছু পরবর্তিতে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন বক্তব্যে ও মন্তব্যে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ দিল্লির আন্দোলনটিকে  ‘মোদির সরকার পতনের’ আন্দোলন হিসেবে দেখতে আগ্রহী। তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: কোনো আন্দোলনের প্রাথমিক দাবি এবং তার চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য কি সব সময় এক থাকে? নাকি রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের নেতৃত্ব ও সহযোগী রাজনৈতিক শক্তিগুলো সেই আন্দোলনের লক্ষ্য ও কর্মসূচিকে নতুন দিকে পরিচালিত করতে পারে? বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারের পতনের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। এই পরিবর্তন কেবল স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষের ফল না,  এর সঙ্গে পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল ও বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সক্রিয় ভূমিকা যুক্ত ছিল—যেটাকে ডঃ ইউনূস অতি খুশিতে মুখ ফসকে “Meticulously Designed” প্ল্যান হিসাবে বলে ফেলেছিলেন।

যে কোন মূল্যে সংবিধান রক্ষা করার ব্রত

ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য রাহুল গান্ধী দিল্লির গণআন্দোলনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন,

“আমরা আমাদের সংবিধান রক্ষা করব। আমরা ভারতীয় জনগণের কণ্ঠস্বরকে সুরক্ষিত রাখব। গত ১০–১৫ বছরে ভারতের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা যেন আর কখনোই করা না হয়, তা নিশ্চিত করব। ভারতের তরুণদের নিয়ে আমি গর্বিত। প্রতিবাদ চালিয়ে যাও। আমরা তোমাদের পাশে আছি। আমরা নিশ্চিত করব, এই শাসনব্যবস্থা এবং যারা আমাদের সংবিধানের ওপর আঘাত হেনেছে, তারা পরাজিত হবে।”

রাহুল গান্ধীর এই বক্তব্যে দিল্লির আন্দোলনের ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট—সংবিধান রক্ষা, জনগণের কণ্ঠস্বর সুরক্ষিত রাখা এবং সংবিধানের ওপর আঘাত হানার অভিযোগে অভিযুক্ত শাসকগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করা। অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্যে সংবিধানকে পরিবর্তনের লক্ষ্য নয়, বরং জনগণের অধিকার রক্ষার ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এখানেই বাংলাদেশের জুলাই গণআন্দোলনের নেতৃত্বের অংশের অবস্থানের সঙ্গে মৌলিক পার্থক্যটি সামনে আসে।

“জুলাই সনদ” ও দায় মোচন

বাংলাদেশের জুলাই গণআন্দোলনের পর এর নেতারা সংবিধান পরিবর্তন এবং ‘জুলাই সনদ’-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো পুনর্গঠনের পক্ষে অবস্থান নেয়। এই প্রক্রিয়ায় সংবিধানের প্রস্তাবনা ও চার মূলনীতি বাদ দেওয়ার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত এসব বিষয় পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে দেশের প্রতিষ্ঠাতাদের ঐতিহাসিক অবদান মুছে ফেলার প্রয়াস হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা—স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও রাষ্ট্রের মূল আদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে এসব বিষয় বাদ দেওয়া বা পরিবর্তনের উদ্যোগ কেবল সাংবিধানিক কাঠামোর প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার এবং স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ভিত্তি।

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, জুলাই থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, ধ্বংসযজ্ঞ এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডের দায় নির্ধারণ। জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব  ‘দায়মুক্তি’ বা ‘ইনডেমনিটি’র মাধ্যমে ওই সময়ের সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের জন্য দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করেছে। এ ধরনের উদ্যোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো—রাষ্ট্রের কাঠামো পরিবর্তনের পাশাপাশি অতীতের কর্মকাণ্ডের বিচার ও জবাবদিহিতা এড়ানো।

কোনো আন্দোলনের নেতৃত্ব সংবিধান পরিবর্তনের দাবি তুলতেই পারে; কিন্তু সেই পরিবর্তনের মাধ্যমে যদি ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং একই সঙ্গে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের দায় নির্ধারণের পথ সংকুচিত করার আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে সেই আন্দোলনের ঘোষিত লক্ষ্য ও রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।

আন্দোলনের চরিত্রেও পার্থক্য

দিল্লি ও ঢাকার আন্দোলনের মধ্যে পার্থক্য কেবল রাজনৈতিক লক্ষ্য বা সংবিধান সম্পর্কে অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আন্দোলনের পদ্ধতি ও আচরণ নিয়েও তুলনা করা প্রয়োজন।

দিল্লির আন্দোলনে লাখো মানুষ অংশ নিচ্ছেন, কিন্তু দু’দফা আন্দোলনেও তাদের প্রতিবাদ অহিংস রয়েছে। তাঁরা সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ক্ষতি করছেন না, জনসম্পত্তি ধ্বংস করছেন না এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছেন না। রাহুল গান্ধীর বক্তব্যেও তরুণদের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার আহ্বান রয়েছে, পাশাপাশি সংবিধান রক্ষার রাজনৈতিক লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সরকারি ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা এবং তাঁদের হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা আন্দোলনের চরিত্র ও পরিণতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ধ্বংস কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হত্যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার বিষয় নয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা এবং তাদের সদস্যদের প্রাণহানির পরিস্থিতিতে বাহিনীগুলো নিজেদের ও অন্যদের জীবন রক্ষার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকে অতিরিক্ত বল প্রয়োগে বাধ্য হয়েছিল। জুলাই আন্দোলনকারীদের পরিবর্তিত উদ্দেশ্য এবং জীবন রক্ষা ও নিরাপত্তার তাগিদে নেয়া পদক্ষেপ, পরিস্থিতিকে এমন এক দিকে নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফেরার আর কোন অবস্থা ছিলো না, ফেরা সম্ভব হয় নাই।

সংবিধান রক্ষা, না সংবিধান বদল?

দিল্লির আন্দোলন সম্পর্কে রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু হলো সংবিধান রক্ষা এবং জনগণের কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক অবস্থান ও সরকার পতনের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে উঠে এসেছে সংবিধান পুনর্লিখন বা পরিবর্তন, রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে নতুন অবস্থান এবং অতীতের সহিংসতার দায় নির্ধারণের প্রশ্ন।

এই দুই অবস্থানকে এক করে দেখলে আন্দোলনের লক্ষ্য ও রাজনৈতিক তাৎপর্যের গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো আড়ালে পড়ে যায়। কোনো আন্দোলনকে মূল্যায়ন করতে হলে শুধু তার নাম, জনসমাগম কিংবা শাসকবিরোধী অবস্থান দেখলেই চলে না; দেখতে হয় আন্দোলনটি কী দাবি করছে, সংবিধানের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী, প্রতিবাদের পদ্ধতি কেমন এবং সহিংসতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে তার অবস্থান কোথায়।

গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তি কেবল জনসমর্থনে নয়, তার লক্ষ্য ও পদ্ধতির মধ্যেও নিহিত। সংবিধান রক্ষার দাবি এবং সংবিধানের মৌলিক ভিত্তি পরিবর্তনের দাবি এক বিষয় নয়। একইভাবে, অহিংস প্রতিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংস বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর প্রাণঘাতী হামলাও এক ধরনের কর্মকাণ্ড নয়।

অতএব, দিল্লির আন্দোলন ও বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একই পাল্লায় মাপার আগে তাদের ঘোষিত লক্ষ্য, সাংবিধানিক অবস্থান, আন্দোলনের পদ্ধতি এবং জবাবদিহির প্রশ্নে অবস্থান আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই পার্থক্যগুলোই নির্ধারণ করবে—কোন আন্দোলন রাষ্ট্র ও জনগনের অধিকার রক্ষা করতে চাইছে, আর কোন আন্দোলন নির্দিষ্ট গোষ্ঠির জন্য রাজনৈতিক সুবিধা পেতে চাইছে।

অতএব, শাসকবিরোধী অবস্থান থাকলেই দুটি আন্দোলনকে একই প্রকৃতির বলা যায় না। আন্দোলনের লক্ষ্য, দাবির ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং সাংবিধানিক প্রশ্নে অবস্থান—এসবের পার্থক্যই নির্ধারণ করে দেয় একটি আন্দোলন কোন পথে এগোচ্ছে। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের দাবি থেকে সরকার পতনের এক দফায় উত্তরণের বিষয়টি যেমন রাজনৈতিক বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তেমনি দিল্লির আন্দোলনের ক্ষেত্রে মূল দাবিতে অটল থাকার বিষয়টিও আলাদা করে বিবেচনার দাবি রাখে। এই কারণেই দিল্লির আন্দোলন ও বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে শুধু শাসকবিরোধী জনআন্দোলন হিসেবে একই পাল্লায় মাপা যথেষ্ট নয়।

Visited 3 times, 3 visit(s) today