মতামত || ব্যক্তিগত বঞ্চনা-লাঞ্ছনা ছাড়া দেশ-মানুষের কোনো সংকটেই পাশে থাকে না ‘জুলাই-সংশ্লিষ্টরা’

মতামত || ব্যক্তিগত বঞ্চনা-লাঞ্ছনা ছাড়া দেশ-মানুষের কোনো সংকটেই পাশে থাকে না ‘জুলাই-সংশ্লিষ্টরা’
শেয়ার করুন
–  হাসান মাহমুদ টিপু, সহযোগী অধ্যাপক
আইন ও আইন বিষয়ক অধ্যয়ন বিভাগ, কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়

(এক)

আজ দেখলাম হো চি মিন বিশাল একটা পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন যে তিনি শুধু ট্র‍্যান্সজেন্ডার হওয়ার কারণে তাকে নিয়ে মব করা এবং এর ফলে তাকে সিআইএর এন্ডোমেন্ট ফান্ডে চলা জিল্লুর রহমান ও আলী রীয়াজের সিজিএস বে অব বেঙ্গল কনফারেন্সে প্রবেশে বাঁধা দিয়েছে। এটা নিয়ে তিনি যৌক্তিক প্রতিবাদ করেছেন। জিল্লুর রহমানের উপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠির অধিকার নিয়ে আমি সবসময় কথা বলে আসছি। হোচিমিনের সাথে ঘটে যাওয়া এরকম ঘটনার প্রতিবাদও করলাম।
হোচিমিন বাংলাদেশে ডিপস্টেটের খেলার পুতুল সবসময়ই ছিলেন। তার এই ট্রান্সজেন্ডার কার্ড দিয়ে কত ঘটনাই না ঘটানো হয়েছে! আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকতে তাকে দেখা যেত বিভিন্ন দেশের এম্বাসিতে ঘুরঘুর করতে। যেমনটা ঘুরঘুর করতে দেখা গেছে আজমেরি হক বাঁধন, চাকমা রাণী, শহিদুল আলম, জুনায়েদ সাকীদের।
জুলাই আন্দোলনের অনেক আগে থেকেই ইউএসএইড এর টাকায় কিভাবে একটা ইনক্লুসিভ আন্দোলন জমানো যায় তার ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল। সিজিএস সেই কাজটা আগায়ে নিয়ে গণতন্ত্র প্র‍্যাক্টিসের নামে। হোচিমিন সেই কাজে সিজিএসকে বরাবর উপকৃত করেছে।

(দুই)

জুলাই আন্দোলন ছিল একটা পলিটিক্যাল আন্দোলন। মানে কোটা আন্দোলনের স্বার্থপর দাবীর মোড়কে শুরু থেকেই এই আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনার পতন। এটা দেশের ৯০% এর বেশি মানুষ বুঝতে পারেনি, কারণ আন্দোলনকে অরাজনৈতিক রুপ দেওয়া হয়েছিল।
জুলাইয়ের এই আন্দোলনকে খুবই সুক্ষ্মভাবে প্ল্যান করা হয়েছিল। অরাজনৈতিক রুপ দিতে সিজিএসসহ ডিপস্টেটের সাহায্যে ও পরিকল্পনায় সারা দেশের পাবলিক ইউনিভার্সিটি থেকে সমন্বয়ক কমিটি গঠন করা হয়। সেই সমন্বয়ক কমিটিতে “আই হেইট পলিটিক্স” বলা গুপ্ত শিবির নেতা-কর্মিকে অন্তর্ভূক্ত করে ২০০৭ সালের ইউনুসের নাগরিক শক্তির আদলে তৈরি “ছাত্রশক্তি”র নাহিদ, আসিফ, কাদের, আখতাররা। হাসনাত, সার্জিস, মাহফুজ, মাহিন, সাদিক কায়েমরা এতে যুক্ত ছিল শিবিরের গুপ্ত হিসেবেই। ফলে তাদেরকে রাজনৈতিক হিসেবে ধরা কষ্টকর ছিল। আর ১২-১৩ জনের “ছাত্রশক্তি”র সক্ষমতা কতটুকুই বা হতে পারে!
এই সমন্বয়ক কমিটিতে ছিল নারী, পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। হোচিমিনরা নিশ্চিত করেছে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে এদের সাথে কাজ করতে পারে। হোচিমিনের মতো অন্যান্য সেক্টরেও দাবার গুটি ছিল।
কোটা আন্দোলনের মোড়কে সরকার পতনের আন্দোলনকে একটা নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম রুপ দিতে কমিটিতে লিবারেল ও কনজার্ভেটিভ ছেলে-মেয়ে (জিন্স-টিশার্ট পড়া মেয়ে, হিজাবী-নেকাবি মেয়ে), লেবাসধারী হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ধর্মের ছেলেমেয়ে, আদিবাসী ছেলেমেয়ে, ট্র‍্যান্সজেন্ডার, র‍্যাপার, এলিট-প্রান্তিক সকল বিষয়কে এক সূতায় (ইনক্লুসিভ) গাথা হয়েছিল, যাতে এটা যে পলিটিক্যাল, সেটা বোঝা না যায়।
হুট করে “নিরপেক্ষ” বা “অরাজনৈতিক” এমন প্ল্যাটফর্ম দাঁড় করা অসম্ভব ব্যাপার। যা ড. ইউনুসসহ কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলেছেনও। আপনাদের মনে থাকার কথা, ড. ইউনুস নিউইয়র্কে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে শফিকুল আলমের চ্যালা মাহফুজ আলমকে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় বলেছিলেন যে শেখ হাসিনাকে সরকার থেকে ফেলে দিতে তারা দীর্ঘ পরিকল্পনা করেছিল। তার ভাষায় তিনি এটাকে “মেটিকুলাসলি ডিজাইন্ড” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
উনি এটাকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন যে এই আন্দোলন এমন ছিল না যে একদিন সকালে উঠে রাস্তায় নেমে দাবী দাওয়া চাইলাম, আর দাঁড়ায় গেল! তার মতে এটা ছিল দীর্ঘদিনের প্ল্যানের মাধ্যমে অর্জিত সফলতা।
এইরকম প্ল্যানকে ইমপ্লিমেন্টেশনের জন্য যা যা লাগে তাই তাই করেছে তারা। যৌক্তিক দাবীতে সকল শিক্ষার্থীর সমর্থন আদায়ের কথা চিন্তা করে একটা “নিরপেক্ষ” বা “অরাজনৈতিক” ও “ইনক্লুসিভ” ছাত্র আন্দোলনে রুপ দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। এরপর শিক্ষিত-উচ্চ শিক্ষিত রাজনীতিবিমুখ মানুষ, সরকারবিরোধী মানুষ, প্রান্তিক মানুষ (যাদের জীবনের উন্নয়ন কখনো ঘটে না), ফ্রাস্ট্রেটেড মিডলক্লাস, অধিকার বঞ্চিত মানুষ, কট্টর ইসলামপন্থিদেরকে দলে টানার জন্য একটা স্পার্ক দরকার ছিল।
সেই স্পার্ক তৈরি করতে সাহায্য করেছিল আমেরিকান এম্বাসি। সেখানে কাজ করে আসিফ নজরুলের স্ত্রী শীলা আহমেদসহ অনেকেই যারা ডিপস্টেটের সাথে কানেক্টেড। ২০২৪ এর জুলাইয়ের ১৫ তারিখে আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ফোরামে ঢাকায় দুইজন ছাত্র হ/ত্যার খবর ছাপে। অথচ সেদিন কোন ছাত্র আহতও হয়নি। তাদের এরকম খবরের প্রতিবাদ জানায় তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়।
এটা ছিল মূলত আন্দোলনকারীদের জন্য তাদের সিগনাল। পরের দিন তাদের সাথে ছাত্রলীগের মারামারি হলো। তন্বীর রক্তমাখা মুখের ভীতিজড়ানো ছবি প্রকাশ হলো। ফারহানাজ রশীদ দিয়াদের কল্যানে মে?টার “ভায়োলেন্সের ছবি হাইড” এর পলিসি চেইঞ্জ হলো। ফেসবুক ছয়লাব হয়ে গেল শুধু আন্দোলনকারীদের আহত হওয়া ছবি ও ভিডিওতে। প্রচুর টেইলর্ড ভিডিও (ছাত্রলীগের হাতে মাইর খাওয়ার ভিডিও) হাজার হাজার পেইজ থেকে দাবানলের মতো প্রকাশ পেতে থাকলো। প্রথম আলো-ডেইলি স্টার মিডিয়া লিড নিয়ে নিলো। তারা যেসব ছবি প্রকাশ করবে বাকিরাও তাই করবে। ফলে সংঘাতের একপাক্ষিক ছবি, ভিডিও, স্টোরি, ন্যারেটিভ আসতে থাকায় সকল মানুষের সমর্থন আদায় হলো।

এটা ছিল দ্বিতীয় স্টেজ।

এরপরের স্টেজে দেশের সকল মানুষের সমর্থন পেতে লাশ দরকার পড়ে। আবু সাঈদকে গুলির ভিডিও যদি আপনারা দেখেন তবে দেখবেন ভিডিওটার সোর্স একটাই। কিন্তু বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে নেওয়া। ফলে বোঝাই যায় এটা টেইলর্ড বা কয়েকটা ভিডিও থেকে নিয়ে যতটুকু দরকার ততটুকু প্রকাশ করা। আবু সাঈদের গুলির সামনে দাঁড়ানোর আগে পুলিশকে লাঠি দিয়ে আঘাত করার ভিডিও তখন প্রকাশ করেনি। সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসেছে ৫ই আগস্টের পরে। বআই দ্যা ওয়ে, যে পুলিশকে গুলি করতে দেখা গিয়েছিল সেই পুলিশ এখন কোথায় কেউ জানেন?
পুরো সময় জুড়ে আন্দোলনে প্রথমআলো-ডেইলি স্টার, যমুনা টিভি, মেটা, এনজিওরা সরকার ফেলে দিতে চরম খেলা খেলেছে। মিডিয়া পুলিশ-বিডিআর-আর্মি-র‍্যাবের গুলি করে মানুষ হ/ত্যাসহ এতোকিছু দেখিয়েছে, কিন্তু মেট্রোরেলে কে বা কারা কিভাবে আগুণ দিতে গেল তা দেখায়নি। একইভাবে আন্দোলনকারীরাই সেদিন শুধু মাইর খায়নি, তারাও মাইর দিয়েছে। সেগুলো মিডিয়া প্রকাশ করেনি। ছাত্রলীগকে মেরে হলগুলো থেকে বিতাড়িত করেছে, সেসব কোন নিউজ মিডিয়াতে আসেনি। চট্টগ্রামে এক বাড়ির ছাদ থেকে ছাত্রশিবির ছাত্রলীগের কর্মীদের মেরে ৫ তলা ভবন থেকে ছুড়ে ফেলে।দিয়েছে, সেসবও মিডিয়ায় আসেনি। ১৬ই জুলাইতে ওয়াসিমসহ যারা মারা গেছিল সেসবের ভিডিও আসেনি।

(তিন)

হোচিমিনের আক্ষেপ নিয়ে শুরু করেছিলাম। তিনি আন্দোলনের অন্যতম স্টেকহোল্ডার। গণতন্ত্র ধ্বংসকারীকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দিয়ে দেশে নতুন করে গণতন্ত্র কায়েমে সিজিএসসহ এনজিও, সিভিল সোস্যাইটিকে সাহায্য করেছেন হোচিমিনরা। ট্র‍্যান্সজেন্ডারদের অধিকার আরো বেশি করে রক্ষা হবে এমন ভাবনাই তো ছিল তার। হয়নি যে সেটা হোচিমিনের ভাষ্যেই বোঝা যাচ্ছে।
হাজার হাজার কিশোর তরুণদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার দায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কেরও আছে। আন্দোলনের নেতাদের সরকারের সাথে আলাপের প্রস্তাব নাকচ করার বুদ্ধিটা তানজিমুদ্দিন, সামিনা, গীতিআরারাই দিয়েছিলেন। পৃথিবীর খুব কম রাষ্ট্রগুলো, সরকারগুলো জনবান্ধব। এরকম ভয়ংকর ক্রাইসিস মূহুর্তে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আক্রমণের মাধ্যমে সহিংস আন্দোলন চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছেন। এরপর, নিজেরা অরাজনৈতিক হিসেবে সবাইকে দেখালেও “এক দফা”র মতো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দিয়ে দেশটাকে ধ্বংসের দ্বারগোড়ায় নিয়ে গেল। সেই ধ্বংসের দায়মুক্তি শুরু হয়েছে নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে দিয়ে।
Visited 16 times, 5 visit(s) today