৫ মাস বেতন বন্ধের পর বন্ধ হয়ে গেল বেঙ্গল শ্যু, এক ধাক্কায় বেকার ২ হাজার শ্রমিক

৫ মাস বেতন বন্ধের পর বন্ধ হয়ে গেল বেঙ্গল শ্যু, এক ধাক্কায় বেকার ২ হাজার শ্রমিক
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


জোসনা আক্তার (৩৩) প্রায় এক দশক আগে স্বামীর মৃত্যুর পর কলেজপড়ুয়া দুই মেয়ে ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর কঠিন সংগ্রাম। স্বজনদের সহায়তায় লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে অবস্থিত পরিচিত বেঙ্গল শ্যু ইন্ডাস্ট্রিজে মাসে ছয় হাজার টাকা বেতনের কাজ জোটে তাঁর। ওই আয়েই কোনোরকমে চলছিল সংসার। কিন্তু কারখানাটি হঠাৎ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চার সদস্যের পরিবার নিয়ে এখন দিশেহারা জোসনা।

কারখানার প্রায় দুই হাজার শ্রমিকও জোসনার মতো অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। টানা পাঁচ মাস বেতন বকেয়া থাকা এবং কর্মহীন হয়ে পড়ার পর মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তাঁরা।

২রা অক্টোবর, শুক্রবার বিকেলে কারখানার পাশে জোসনা আক্তার, শারমিনসহ অন্তত ১২ জন নারী ও পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্যে মিল রয়েছে। কেউ বাবাকে হারিয়েছেন, কারও স্বামী নেই, আবার কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। কাজ হারানোর পর কয়েক মাস ধরে অনেকের পরিবারে নিয়মিত দুই বেলা খাবারও জুটছে না।

রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের রাখালিয়া এলাকায় অবস্থিত বেঙ্গল শ্যু ইন্ডাস্ট্রিজ প্রায় দুই দশক ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। তবে চলতি বছরের ১৫ই মে মালিকপক্ষ হঠাৎ কারখানার ফটকে স্থায়ীভাবে বন্ধের নোটিশ টাঙিয়ে দেয়।

চাকরি হারানো শ্রমিকেরা বলছেন, পুরুষদের অনেকে অন্য কাজে বা অন্য প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হতে পারলেও নারীরা পড়েছেন বড় সংকটে। সোনাপুর এলাকার শ্রমিক সুমি আক্তারের কথায়, “পুরুষ শ্রমিকদের অনেকে অন্যত্র নতুন কাজ পেয়ে গেছে। কিন্তু আমরা যুবতী ও মধ্যবয়সী নারীরা কোথাও কাজ পাচ্ছি না। বিসিক শিল্প নগরীতে যোগাযোগ করেও কোনও ব্যবস্থা হয়নি। বিধবা বা একার আয়ে চলা নারীদের টিকে থাকাই এখন দায়।”

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হালিম, শফিকুল ইসলাম ও মো. বেল্লালও একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, সামান্য জমানো অর্থে দিন চালালেও স্থানীয় বাজারে নতুন কাজের সুযোগ কম, আর মজুরিও খুবই কম।

বেঙ্গল শ্যু ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় কারখানা বন্ধের ঘটনা জেলাজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর আগে বকেয়া বেতন পরিশোধ ও কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে কর্মহীন শ্রমিকেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়।

রুপালি ব্যাংক ও ডাচ বাংলা ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত জটিলতা এবং আর্থিক সংকটের কারণে কারখানাটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে মালিকপক্ষের দাবি। তবে ঠিক কী ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা তাঁরা বিস্তারিত জানাতে চাননি।

বেঙ্গল শ্যু ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী টিপু সুলতান ও সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) বিপ্লব পাল বলেন, “বিগত ২০ বছর ধরে লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলিয়ে আমরা কারখানাটি চালিয়ে আসছিলাম। ব্যাক টু ব্যাক এলসি সুবিধা বন্ধ হওয়া ও ব্যাংকিং জটিলতার কারণে আমরা নিরুপায় হয়ে পড়েছি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ, ব্যাংকিং সুবিধা পুনরুজ্জীবিত করে লে-অফ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।”

রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, ব্যাংক সুবিধাসংক্রান্ত সংকটের কারণে কারখানাটি বন্ধ হয়েছে বলে তিনি জেনেছেন। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মালিকপক্ষ কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করে।

জেলার অন্যতম বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেঙ্গল শ্যু ইন্ডাস্ট্রিজ আবার চালুর জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন রায়পুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়া।

তাঁর ভাষায়, “হাজারো পরিবারের স্বচ্ছলতা জড়িয়ে ছিল এই কারখানার ওপর। এটি বন্ধ হওয়ায় বিরাট একটি জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থান রক্ষায় সরকারের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”

লক্ষ্মীপুরে নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা অর্ধশতাধিক। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বেঙ্গল শ্যু ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

Visited 11 times, 1 visit(s) today