❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটে দেশের পোশাকশিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে। এখন পর্যন্ত বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমায়নি। তবে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বর্তমানে রপ্তানিকারকেরা ডিজেল, ধানের তুষ, কাঠসহ তুলনামূলক ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হলেও বেড়ে যাচ্ছে উৎপাদন ব্যয়। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
চারটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ঢাকার প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আপাতত বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমানোর পরিকল্পনা নেই তাদের। বরং একটি ইউরোপীয় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কাছে তাদের ক্রয়াদেশ কিছুটা বেড়েছে।
স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড পুমার ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান মঈন চৌধুরী বলেন, গ্যাস সংকটে রপ্তানিকারকদের কষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। তবে তাঁরা এখনো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করছেন।
‘অর্ডার কমানোর কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই,’ বলেন তিনি।
ছয়জন রপ্তানিকারকের সঙ্গে কথা হলে তাঁদের মধ্যে একজন ছাড়া কেউই ক্রয়াদেশ কমার কথা জানাননি। তবে গ্যাসের চাপ কম থাকায় একটি টেক্সটাইল মিল জানিয়েছে, ক্রেতাদের চাহিদা থাকলেও তারা নতুন ক্রয়াদেশ নিতে পারছে না।
গত দুই বছর ধরেই দেশে গ্যাসের সংকট চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা এবং সর্বশেষ জুলাইয়ে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোয় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমেছে বা বন্ধ রয়েছে।
এখনো ক্রয়াদেশ কমাচ্ছে না বড় ক্রেতারা
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি শীর্ষস্থানীয় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ঢাকার কার্যালয়ের প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশ থেকে ক্রয়াদেশ কমানোর কোনো পরিকল্পনা আপাতত তাদের নেই।
প্রতিষ্ঠানটি বছরে বাংলাদেশ থেকে ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পোশাক আমদানি করে। দেশে তাদের শতাধিক সরবরাহকারী রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, তারা নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবু প্রায় সবাই সময়মতো পণ্য সরবরাহ করছে। ডিজেল কিনে কারখানা চালাতে হচ্ছে। ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু তারা পণ্য সরবরাহ করছে।’
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ১০ রপ্তানিকারকের প্রায় সবাই তাদের সরবরাহকারী বলেও জানান তিনি।
ইউরোপের আরেকটি শীর্ষস্থানীয় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ঢাকার একজন কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের সরবরাহকারীরাও এখন পর্যন্ত সময়মতো পণ্য সরবরাহ করছেন। ফলে ক্রয়াদেশ কমানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং সম্প্রতি কিছু সরবরাহকারীর ক্ষেত্রে ক্রয়াদেশ বেড়েছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো ক্রেতা গ্যাস সংকটের কারণে ক্রয়াদেশ কমানোর কথা জানাননি। তবে তাঁরা নিয়মিত পরিস্থিতির খোঁজ নিচ্ছেন।
‘তারা উদ্বিগ্ন ও বিরক্ত,’ বলেন তিনি।
বছরে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করা স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, কারখানা সচল রাখতে তাঁদের ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবে কোনো শিপমেন্ট সময়মতো দিতে দেরি হয়নি।
তাঁর ভাষ্য, ‘আমাদের কোনো ক্রেতা অর্ডার কমানোর কথা বলেননি।’
তবে ডিজেল ব্যবহারের কারণে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মাসে প্রায় ৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এক-তৃতীয়াংশ কমেছে একটি ক্রেতার ক্রয়াদেশ
সব ক্রেতা যে একই অবস্থানে আছে, তা নয়। এমবি নিট ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ইউরোপের একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিশ্রুত ক্রয়াদেশের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে তারা ঝুঁকি নিতে চাইছে না।’
অন্যদিকে মিথিলা গ্রুপের চেয়ারম্যান আজহার খান বলেন, তাঁদের কারখানায় উৎপাদনের জন্য ১০ পিএসআইয়ের বেশি গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। অথচ বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে শূন্য থেকে এক পিএসআই।
বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করেও সক্ষমতার ৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
‘ক্রেতা অর্ডার দিতে চাইছে, কিন্তু আমরা অর্ডার নিতে পারছি না,’ বলেন আজহার খান।
বাড়তি ব্যয়ে উৎপাদন চালু
গ্যাসের সংকট সামাল দিতে পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানাগুলো এখন বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে। কোথাও ডিজেল, কোথাও ধানের তুষ, আবার কোথাও কাঠ ব্যবহার করে বয়লার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালানো হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির ব্যবহারও বাড়িয়েছে।
অনন্ত গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনামুল হক খান বাবলু বলেন, তাঁদের কারখানায় বয়লার চালাতে ধানের তুষ ব্যবহার করা হচ্ছে।
আজহার খান বলেন, উৎপাদন সচল রাখতে তাঁরাও তুষ ও ডিজেল ব্যবহার করছেন। নরসিংদীর কিছু উইভিং মিল কাঠ পুড়িয়ে উৎপাদন চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
শিল্পমালিকেরা বলছেন, গ্যাসের তুলনায় ডিজেল দিয়ে উৎপাদন করতে তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেশি ব্যয় হচ্ছে। ফলে ক্রয়াদেশ ঠিক থাকলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানিকারকদের মুনাফায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
পোশাক রপ্তানিতে বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের। অন্যান্য টেক্সটাইল পণ্য যুক্ত করলে রপ্তানি আয় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার।
দেশের পোশাকশিল্পের বড় অংশই টেক্সটাইল খাতের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাস ব্যবহার করে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সুতা, কাপড় ও অন্যান্য উপকরণ তৈরি করা হয়। ফলে টেক্সটাইল খাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পোশাক কারখানায়।
সরকারের পক্ষ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে গ্যাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০ আগস্ট পর্যন্ত পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে জানিয়েছেন শিল্পমালিকেরা।
এ অবস্থায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বাড়তি ব্যয় এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা নিয়ে ক্রেতাদের উদ্বেগ বাড়ছে। এখন পর্যন্ত বড় ক্রেতারা ক্রয়াদেশ ধরে রাখলেও দীর্ঘস্থায়ী সংকট অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে বিকেএমইএর বৈঠক
গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পের ওপর তৈরি হওয়া চাপ এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে আজ বৈঠকে বসছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্যরা।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বিদ্যমান গ্যাস সংকট পরিস্থিতিতে শিল্পমালিকদের করণীয় ঠিক করতে আমরা বৈঠকের আয়োজন করেছি। বৈঠকের পর আমরা সিদ্ধান্ত নেব। সম্ভবত রোববার সংবাদ সম্মেলন করে আমাদের অবস্থান জানাতে পারি।’
