❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা বলছেন, ঘটনাটি এতটা সরল নয়। তাদের দাবি, সব দিক খতিয়ে দেখে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে।
ঐক্য পরিষদের নেতারা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হত্যা, হামলা ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনায় তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পেছনের উদ্দেশ্য যথাযথভাবে উদ্ঘাটন হচ্ছে না বলেও তারা অভিযোগ করেন।
ফলে কোনো সংখ্যালঘু পরিবারের একাধিক সদস্যের একসঙ্গে এমন মৃত্যু হলে সেটিকে শুধু একটি সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে তাদের মত।
তাদের দাবি, গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। এটি ডাকাতির ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
মাছুয়াপাড়ার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে শনিবার রাতে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, মেয়ে এবং ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী।
স্বজনদের সঙ্গে কয়েক দিন যোগাযোগ না থাকায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরে বাড়িতে গিয়ে দরজা-জানালা বন্ধ ও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। এরপর বাড়ির তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়।
ঘটনাস্থলের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় বাড়ির ছাদে। তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ পড়ে ছিল সিঁড়িতে। আর ছেলে প্রীয়মের মরদেহ পাওয়া যায় একটি খাটের নিচে। কয়েক দিন মরদেহগুলো পড়ে থাকায় বাড়ির ভেতরে পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশ ও সিআইডি। তদন্তকারীরা বাড়ির ভেতরে এলোমেলো অবস্থা এবং টাকা ও স্বর্ণালংকার রাখার সম্ভাব্য স্থানগুলোতে ভাঙচুরের আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়।
এসব আলামতের ভিত্তিতে সিআইডির প্রাথমিক ধারণা, ডাকাতির উদ্দেশ্যে বাড়িতে প্রবেশের পর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায়
ঐক্য পরিষদের নেতারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ নানা ধরনের হামলা, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনায় তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, কিছু ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান তদন্ত না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।
তারা বলেন, গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনাতেও যদি শুরুতেই শুধু ‘ডাকাতি’ ধরে নিয়ে তদন্ত সীমাবদ্ধ করা হয়, তাহলে প্রকৃত কারণ অজানা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই হত্যাকাণ্ডের ধরন, বাড়িতে প্রবেশের পদ্ধতি, লুটপাটের বিষয়, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ ছিল কি না এবং অন্য কোনো উদ্দেশ্য জড়িত ছিল কি না—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঐক্য পরিষদের নেতারা বলেন, নিহতরা যে সম্প্রদায়েরই হোন না কেন, একটি পরিবারের চারজন মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা। তবে সংখ্যালঘু পরিবারের ক্ষেত্রে এমন ঘটনায় তৈরি হওয়া অতিরিক্ত নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টিও প্রশাসনকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তাদের দাবি, দ্রুত ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষা শেষ করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
