রংপুরের গণপতি পরিবার হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের ভাষ্যকে ‘জজ মিয়া নাটক ২.০’ বলছেন স্থানীয়রা

রংপুরের গণপতি পরিবার হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের ভাষ্যকে ‘জজ মিয়া নাটক ২.০’ বলছেন স্থানীয়রা
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব সংবাদদাতা


রংপুরে চাঞ্চল্যকর গণপতি চক্রবর্তীকে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ হত্যার ঘটনায় পুলিশের ভাষ্যকে স্থানীয়রা ‘জজ মিয়া নাটক ২.০’ বলে ক্ষোভ জানিয়েছেন। তুমুল সমালোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।

গণপতি পরিবারের সদস্যদের হত্যার পেছনে পুলিশের ভাষ্য, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করেছে।

পুলিশের এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্থানীয়রা এমন দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

২০০৪ সালের একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার নিরপরাধ পার্থ সাহা ও জজ মিয়াকে আটক করে তাদেরকে গ্রেনেড হামলাকারী হিসেবে সাজিয়ে বছরের পর বছর যে নিপীড়ন চালিয়েছিল, সেই একই দৃশ্যের অবতারণা ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করেন গণপতি পরিবারের প্রতিবেশীরা।

আটক মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস

গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত দাবি করে দুজনকে গ্রেপ্তারের পর আজ ২৩শে আগস্ট, রোববার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে রংপুর মেট্রোপলিটনের পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)।

এর আগে ২২শে আগস্ট, শনিবার রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, ‘দুই খুনি’ মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বিল্ডিংয়ের ওপর দিয়ে উনাদের ছাদে আসে বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে। ছাদে বসে ইয়াবা সেবনের শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে পরিচয় গোপন রাখার জন্য তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তার চিৎকারে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

আবদুল মাবুদ বলেন, মায়ের চিৎকারে এগিয়ে আসা মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

পুলিশ কমিশনারের দাবি, খুনিরা পুলিশকে জানিয়েছে- প্রার্থী চক্রবর্তী মারা যাচ্ছিল না, প্রায় চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময় তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরে। সর্বশেষে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মকে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।

তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা বাসার একটি বাথরুমে গোসল করে, ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করে। জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তারা কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় এবং সেগুলো নিকটবর্তী একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখে।

অভিযুক্তদের দেখানো মতে সেসব আলামত জব্দ করা হয়েছে বলে জানান আবদুল মাবুদ।

পুলিশ কমিশনার বলেন, তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য অভিযুক্তরা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখে, যাতে পুলিশ এটিকে ডাকাতি বলে মনে করে। এছাড়া আঙুলের ছাপ যাতে না থাকে সেজন্য বাসার দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় বলেও জানান তিনি।

পুলিশ কমিশনারের বক্তব্যে বিরোধিতা করছেন নেটিজেনরা।

সাকলায়েন মুশতাক নামে একজন লিখেছেন, যদি কেউ ইয়াবা খেতে গেলে কি গামছা ও রশি নিয়ে যায়? এসব কি ইয়াবা সেবনের উপকরণ? দুই ইয়াবাখোর ৪টা মানুষকে খুন করে তাদের ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়া দাওয়া করবে, তারপর স্বর্ণালংকার লুটে নিয়ে যাবে। অথচ সেসব সাথে বহন না করে অনিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে রাখবে? আষাঢ়ে গল্পেরও কিছু সীমা থাকা দরকার।

আব্দুল্লাহ মো. জুবায়ের লিখেছেন, ইয়াবাখোরদের মাথায় কত বুদ্ধি! ৪টা জ্বলজ্যান্ত মানুষ খুন করার পর স্বাভাবিকভাবে সেই বাড়িতে অবস্থান করে, খেজুর-টেজুর খেয়ে কিনা হাতের ছাপ লুকাতে ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে মোবাইল ফোন চুবিয়ে রাখবে হাতের ছাপ নষ্ট করতে? এদের মাথায় এত বুদ্ধি হলে এরা অন্যের ছাদে লুকিয়ে ইয়াবা খেতে যায়?

এদিকে, স্থানীয় সাধারণ মানুষ পুলিশের ভাষ্যকে প্রকৃত ঘটনা আড়ালের চেষ্টা এবং ‘জজ মিয়া নাটক ২.০’ আখ্যা দিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করে তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

Visited 43 times, 1 visit(s) today