-নিজস্ব প্রতিবেদক
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ১১ আগস্ট এক বিশেষ তারিখ হিসেবে বারবার আলোচনায় ফিরে আসে। ভারত ও পাকিস্তান যখন যথাক্রমে ১৫ ও ১৪ আগস্ট নিজ নিজ স্বাধীনতা দিবস পালন করে, তার কয়েকদিন আগে ১১ আগস্ট তারিখটিকে বহু বালুচ জাতীয়তাবাদী সংগঠন “বেলুচিস্তান স্বাধীনতা দিবস” হিসেবে উদযাপন করে। তাদের দাবি, এই দিনটিই সেই সময়কে চিহ্নিত করে যখন কালাত রাজ্য পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার আগে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির প্রাক্কালে, ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ১১ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে কালাতের খান রাজ্যের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। কালাত দাবি করেছিল যে ব্রিটিশ ভারতের সরাসরি শাসিত প্রদেশ না হয়ে ব্রিটিশ রাজত্বের সঙ্গে তাদের একটি চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক ছিল। এরপর কয়েক মাস কালাত একটি পৃথক সত্তা হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
বালুচ জাতীয়তাবাদীদের বিবরণ অনুযায়ী, কালাতের আইনসভা ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে ভোট দেয়। কিন্তু কয়েক মাস পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কালাতে প্রবেশ করে এবং শীঘ্রই কালাতের খান ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’-এ স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে অঞ্চলটি আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কালাত ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানের অধিরাজ্যে যুক্ত হয়, এর আগে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ৩১ মার্চ এই যুক্তিকরণ অনুমোদন করেন, যার মাধ্যমে কালাত পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই যুক্তিকরণ প্রক্রিয়া ছিল ঘটনাবহুল।
দুই বিপরীত অবস্থান
বালুচ জাতীয়তাবাদীরা মনে করেন, এই যুক্তিকরণ স্বেচ্ছায় হয়নি, বরং জোরপূর্বক করা হয়েছিল। তাদের যুক্তি, কালাত ১৯৪৭ সালের আগস্ট থেকে ১৯৪৮ সালের মার্চ পর্যন্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া চাপের মুখে ঘটেছিল। এই বিশ্বাস থেকেই প্রতি বছর পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ও প্রবাসে থাকা বালুচ সংগঠনগুলো অনুষ্ঠান আয়োজন করে, বিবৃতি দেয় এবং বালুচ পতাকা উড়িয়ে দিনটিকে স্মরণ করে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকার এই ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করে। পাকিস্তানের অবস্থান হলো, কালাত অন্যান্য দেশীয় রাজ্যগুলোর মতোই ব্রিটিশ আধিপত্যের অধীনে ছিল এবং বিভাজনের পর তাদের ভারত বা পাকিস্তানের কোনো একটির সঙ্গে যুক্ত হতে হতো। ইসলামাবাদের যুক্তি হলো, ১৯৪৮ সালের মার্চে কালাতের খানের স্বাক্ষরিত যুক্তিকরণ একটি বৈধ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ছিল এবং বেলুচিস্তান কখনো স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল যা পরে দখল করা হয়েছে—এই দাবি তারা প্রত্যাখ্যান করে।
সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া
এবারও বালুচ প্রতিনিধি ও কূটনীতিক মির ইয়ার বালুচ সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে জাতীয় একতার সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ১১ আগস্টকে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপনের ঘোষণা দেন। বালুচ ন্যাশনাল মুভমেন্ট (বিএনএম) ও বালুচ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশনের (বিএসও) মতো সংগঠনগুলো সেমিনার, ধর্না ও বিক্ষোভের মতো বিশ্বব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাকিস্তানের সামরিক শাসনের অধীনে বালুচ জনগণের ওপর চলমান দমন-পীড়নের কথা মনে করিয়ে দিতে চায়।
একটি জটিল ইতিহাস
তবে ইতিহাসের এই বিবরণ নিয়েও মতভেদ রয়েছে। কিছু বিশ্লেষক দাবি করেন, কালাত যখন ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট জিন্নাহর সঙ্গে একটি স্থিতাবস্থা চুক্তি স্বাক্ষর করে ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনার জন্য, তখন খারান, মাকরান ও লাসবেলা কালাতের আধিপত্যের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই পক্ষের যুক্তি হলো, বর্তমান বেলুচিস্তানের অধিকাংশ অঞ্চল কালাতের যুক্তিকরণের আগেই পাকিস্তানের অংশ হয়ে গিয়েছিল, ফলে “পাকিস্তান কালাতের মাধ্যমে বেলুচিস্তান দখল করেছে”—এই দাবি বিতর্কিত।
সব মিলিয়ে, ১১ আগস্ট তারিখটি কেবল ইতিহাসের একটি বিতর্কিত অধ্যায় নয়, বরং তা বালুচ পরিচয়, স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে চলমান একটি রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগত সংঘাতের প্রতিফলন হিসেবেই রয়ে গেছে, যেখানে বালুচ জাতীয়তাবাদী ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের অবস্থান আজও পরস্পরবিরোধী।
