জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত উৎপাদন, ঝুঁকিতে রপ্তানি ও লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান

জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত উৎপাদন, ঝুঁকিতে রপ্তানি ও লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


দেশের শিল্প খাত বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে নজিরবিহীন চাপে পড়েছে। গ্যাসের ঘাটতিতে অধিকাংশ গ্যাসনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। অনেক কারখানা পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন চালাতে পারছে।

শিল্পমালিকদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং শিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এর প্রভাব কর্মসংস্থান, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২২০ থেকে ২৩๐ কোটি ঘনফুট। ফলে দৈনিক প্রায় ১৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

শেখ হাসিনা সরকারের উদ্যোগে নির্মিত মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালয যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি খাতে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলো।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, শ্রীপুর, মৌচাক, চন্দ্রা ও বোর্ডবাজার এলাকার বহু কারখানায় উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে।

যেখানে শিল্পকারখানা পরিচালনায় সাধারণত ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে অনেক স্থানে মিলছে মাত্র ১ থেকে ৩ পিএসআই। ফলে বয়লার, জেনারেটর ও উৎপাদন যন্ত্রপাতি সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, কাগজ, স্পিনিং, পার্টিক্যাল বোর্ড, প্লাস্টিক ও ডাইংসহ দেশের অধিকাংশ রপ্তানিমুখী শিল্প গ্যাসনির্ভর।

উদ্যোক্তারা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না থাকলে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করা সম্ভব হবে না। বিকল্প হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজেল বা এলপিজি ব্যবহার করলেও এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকটের কারণে অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের স্থাপিত সক্ষমতার মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে।

তিতাস গ্যাসের তথ্য বলছে, তাদের আওতাধীন সাড়ে চার হাজারের বেশি শিল্পগ্রাহকের মধ্যে অনেকেই স্বাভাবিক গ্যাসচাপ পাচ্ছেন না। আশুলিয়ায় যেখানে ৭০ পিএসআই থাকার কথা, সেখানে নেমে এসেছে প্রায় ৩০ পিএসআই। একইভাবে আমিনবাজারে দৈনিক ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪০ মিলিয়ন ঘনফুট।

নরসিংদী, মাধবদী, রাজেন্দ্রপুর, কোনাবাড়ী, চন্দ্রা, সাভার-আশুলিয়া, হোতাপাড়া, নেত্রকোনা, জামালপুর ও ভুলতাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার কারখানা এ সংকটে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইস্পাত শিল্পের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসচাপ এতটাই কম যে অনেক স্টিল মিল কার্যত উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন সিরামিক শিল্পের উদ্যোক্তারাও।

তাদের মতে, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব আরও তীব্র হবে।

বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে অর্ধশতাধিক শিল্পকারখানা সম্পূর্ণভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান সক্ষমতার অর্ধেক কিংবা তারও কম উৎপাদন করছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এ অবস্থা দীর্ঘদিন চললে বহু প্রতিষ্ঠানের কার্যকর মূলধন শেষ হয়ে যাবে এবং অনেক শিল্প টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদন বন্ধ রেখেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করছেন। এতে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, সরকারি রাজস্ব আদায় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তিনি শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, চলমান সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন হলে অন্য খাতে সরবরাহ কমিয়ে হলেও শিল্পে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ে করণীয় নির্ধারণে আজ মঙ্গলবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

Visited 11 times, 1 visit(s) today