ব্যায়সংকোচন আর নতুন আঙ্গিকের পরশ নিয়ে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে পর্দা উঠল ২৩তম কমনওয়েলথ গেমসের। বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ দিনব্যাপী এই ক্রীড়াযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস। মূলত ক্রমবর্ধমান খরচ সামলে টুর্নামেন্ট টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যেই এবার তুলনামূলক ছোট পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে এই গেমসের।
১২ বছর পর ফের গ্লাসগোতে ফিরেছে কমনওয়েলথ গেমস। আগামী ১০ দিনে ১০টি ভিন্ন খেলা এবং ৬টি প্যারা-স্পোর্টসে ২১৫টি স্বর্ণপদকের লড়াইয়ে মাঠে নামবেন ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ৩ হাজার অ্যাথলেট।
রানী ক্যামিলাকে সঙ্গে নিয়ে গ্লাসগোর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ১৪ হাজার ধারণক্ষমতার হাইড্রো অ্যারেনায় উপস্থিত হন রাজা চার্লস। বিখ্যাত ব্রিটিশ সায়েন্স-ফিকশন শো ‘ডক্টর হু’-এর কাল্পনিক সময়যান ‘টার্ডিস’-এর আদলে তৈরি মঞ্চ থেকে বেরিয়ে হাসিমুখে উদ্বোধনী আয়োজনের সূচনা করেন তিনি।
উপস্থিত অ্যাথলেটদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাজা চার্লস বলেন, ‘এখানে সমবেত হয়ে আমরা প্রতিটি অ্যাথলেট ও দলের নিষ্ঠা ও দক্ষতাকে উদযাপন করছি। আপনাদের অধ্যবসায় আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আগামী দিনগুলোতে আপনাদের সাফল্যের অপেক্ষায় রইলাম।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘ক্রীড়া ও আমাদের এই পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসা ভাগাভাগি করে নেয়ার মাধ্যমে আসুন আমরা আমাদের পরিবার ও একে অপরের জন্য একটি সুন্দর ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলি। ২৩তম কমনওয়েলথ গেমসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’
১৯৩০ সালে ‘ব্রিটিশ এম্পায়ার গেমস’ হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো ইনডোর স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হলো। তিন বছর আগে চরম সংকটে পড়ে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল এই গেমস। মূলত আয়োজন টিকিয়ে রাখতে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই এই ইনডোর আয়োজন।
সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
২০২৩ সালে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া খরচের অজুহাত দেখিয়ে স্বাগতিক হিসেবে নাম প্রত্যাহার করে নেয় অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্য। সে সময় অনিশ্চয়তায় পড়ে যাওয়া কমনওয়েলথ গেমসকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে গ্লাসগো। তবে ১২ বছর আগে শহরটি যেভাবে গেমসের আয়োজন করেছিল, এবার তার চার ভাগের এক ভাগ খরচে এবং চার বছর আগে বার্মিংহামে হওয়া ১৯টি খেলার সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে টুর্নামেন্টটি মাঠে গড়াচ্ছে।
গ্লাসগো ২০২৬-এর চেয়ারম্যান জর্জ ব্ল্যাক বলেন, ‘যখন এই গেমসের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, তখন গ্লাসগো প্রশ্ন করেনি আমরা পারব কি না; বরং আমরা জানতে চেয়েছিলাম কবে থেকে কাজ শুরু করতে হবে। কারণ এটাই আমাদের সংস্কৃতি। আমরা কঠোর পরিশ্রম করি এবং সবাই মিলে অসাধারণ কিছু ঘটিয়ে দেখাই।’
ইনডোর অ্যারেনায় আয়োজিত এই জমকালো প্যারেডে অ্যাথলেটরা একের পর এক মঞ্চে প্রবেশ করেন। নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ও স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মাঠে উপস্থিত থেকে ক্রীড়াবিদদের অভিবাদন জানান।
উদ্বোধনী প্যারেডে সবচেয়ে বেশি করতালি পায় ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ৬ সদস্যের ছোট দলটি। সম্প্রতি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের পর আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার’ ব্যানার প্রদর্শনের যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার জের ধরেই যেন স্থানীয় দর্শক ও ক্রীড়াবিদরা ফকল্যান্ডসের দলকে উষ্ণ অভ্যর্থনায় ভরিয়ে দেন।
যাদের ওপর চোখ থাকবে ভক্তদের
এবারের গেমসে অ্যাথলেটিক্স ও সাঁতারের পাশাপাশি থাকছে আর্টিস্টিক জিমনেস্টিকস, ট্র্যাক সাইক্লিং, নেটবল, ভারোত্তোলন, বক্সিং, জুডো, বোলস ও থ্রি-অন-থ্রি বাস্কেটবল। এ ছাড়া কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে বড় প্যারা-স্পোর্টস কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
গৃহ মাঠে অনুষ্ঠিত এই গেমসে স্কটল্যান্ডের মূল আকর্ষণ অ্যাথলেট জশ কার, যিনি সম্প্রতি এক মাইল দৌড়ে ২৭ বছরের পুরনো বিশ্বরেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়েছেন।
অন্যদিকে অ্যাথলেটিকসে জ্যাভলিন থ্রোতে পাকিস্তানের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন আরশাদ নাদিম ও ভারতের নিরাজ চোপড়ার হাইভোল্টেজ লড়াই দেখতে মুখিয়ে আছে ক্রীড়াবিশ্ব।
সাঁতারে ইংল্যান্ডের অ্যাডাম পিটি ৫০ ও ১০০ মিটার ব্রেস্টস্ট্রোকে স্বর্ণ জয়ের লক্ষ্যে নামবেন। ১২ বছর আগে এই গ্লাসগোতেই নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক পদক জিতেছিলেন তিনি। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার চাদ লে ক্লোসের সামনে সুযোগ রয়েছে কমনওয়েলথ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল পুরুষ অ্যাথলেট হওয়ার। নিজের ঝুলিতে থাকা ১৮টি পদকের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়াই তার লক্ষ্য।
