❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সরকার উৎখাতের বিক্ষোভ দমনে তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের পর রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টার কয়েকটি মামলার তদন্তে মারাত্মক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন।
তদন্তে দেখা গেছে, কোনো মামলার বাদীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, কোথাও ‘নিহত’ ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় বিদেশে অবস্থান করছেন। কোনো মামলায় গুলিতে নিহত বা আহত হওয়ার দাবি করা হলেও তদন্তে সেই দাবির সমর্থনে কোনো প্রমাণ মেলেনি। এমনকি কোনো কোনো মামলায় ঘটনার সময় ঘটনাস্থল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে অবস্থানরত ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে পুলিশের প্রতিবেদনে।
পটভূমি
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের নামে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হামলা ও হত্যা হয়েছে বলে প্রচার চালানোর পর বিক্ষোভ দীর্ঘায়িত হয়। ঢাকার প্রবেশমুখ যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মোহাম্মদপুরের বছিলা, রামপুরায় ঘটে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড। বিক্ষোভ দীর্ঘায়িত হলে সরকারি স্থাপনা, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চড়াও হয় উগ্রবাদীরা।
অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর-গুপ্ত হত্যা চলতে থাকে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আরও বেড়ে যায়, আক্রান্ত হয় রাষ্ট্রীয় গণভবনও। এক পর্যায়ে ৫ই আগস্ট দেশত্যাগে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।
জাতিসংঘের একটি তথ্যানুসন্ধানে দাবি করা হয়, জুলাই-আগস্টে ১৪০০ লোক নিহত হতে পারে। যদিও সরকারি গেজেট অনুযায়ী নিহত হয়েছে সাড়ে আটশ’র মতো। এই দুটি দাবির মধ্যে মিলেছে অসংখ্য অসঙ্গতি ও ঘাপলা।
মৃতদের ফিরে আসা, বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মৃতকে বিক্ষোভে নিহত দাবি করা, ভিন্নভাবে আহত হওয়াকে বিক্ষোভকারী/জুলাইযোদ্ধা সাজানো- এমন নানাবিধ অনিয়ম ও প্রতারণার ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে।
মামলার পরিসংখ্যান
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর প্রসিকিউশন বিভাগের গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের ঘটনায় রাজধানীর ৫০টি থানায় মোট ৭০৭টি মামলা হয়েছে, যেখানে আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯ জন।
সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে যাত্রাবাড়ী থানায়—১৯টি। এরপর পল্টন মডেল থানায় ১৬টি, হাতিরঝিল ও ভাটারা থানায় সাতটি করে, রামপুরা থানায় পাঁচটি এবং উত্তরা পূর্ব-পশ্চিম, বিমানবন্দর ও দক্ষিণখান থানা মিলিয়ে ১৩টি মামলা হয়েছে। এসবের মধ্যে ১২৬টি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।
এসব মামলায় শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের মন্ত্রী-এমপি, আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ-সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের ব্যাপক হারে আসামি করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে তদন্ত শেষে ১৯টি মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলাকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। বাকি ১৬টি মামলায় তথ্যগত অসঙ্গতি, ভুল পরিচয়, ভুয়া কাগজপত্র এবং ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবতার অমিল পাওয়া গেছে।
আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব অথবা ব্যবসায়িক স্বার্থে নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। বিক্ষোভের ঘটনায় ঢালাও মামলা এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ আগেও গণমাধ্যমে এসেছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বেশ কয়েকটি মামলায় শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগ নেতা এবং পুলিশের সাবেক আইজিসহ কয়েকজনের বিচার পলাতক অবস্থায় ট্রাইব্যুনালে চলছে। একটি মামলায় ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। পুলিশের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তাকেও কয়েকটি মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমমনা দলগুলোর দাবির প্রেক্ষিতে আন্দোলনে ‘সহিংসতার’ অভিযোগ তুলে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে নিষিদ্ধ করেছে মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং সংগঠনটির কার্যক্রমেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
‘আমি মরলে সৌদি আরব এলাম কীভাবে’
২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই রাজধানীর হাতিরঝিলের উলন সড়ক এলাকায় আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে ৪৬ বছর বয়সি মো. বাবু নিহত হয়েছেন—এমন অভিযোগে আদালতে একটি মামলা হয়, যার তদন্তভার পড়ে হাতিরঝিল থানা পুলিশের ওপর।
মামলার এজাহারে বাদী হিসেবে স্বাক্ষর রয়েছে ‘নিহত’ বাবুর খালাতো ভাই পরিচয় দেওয়া ইসমাঈল নামের এক ব্যক্তির। মামলায় শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা এবং পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
২০২৫ সালের ২৬শে অক্টোবর আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজাহারে দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা অনুযায়ী চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বরুরকান্দি গ্রামে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, ‘নিহত’ বাবু আসলে জীবিত। তাঁর প্রকৃত নাম মো. শাকিল এবং তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত।
এ বিষয়ে শাকিল বলেন, “আমি তো মারা যাইনি ভাই। আমি মরলে সৌদি আরব আসলাম কীভাবে? এ বিষয়ে পুলিশ আগেই আমার সঙ্গে কথা বলেছে। এখন আমি সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে কাজ করি।”
তদন্তে বাদীর পরিচয় যাচাই করেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এজাহারে দেওয়া মোবাইল নম্বরে ফোন করলে মিলন পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি জানান, তিনি ইসমাঈল নন। পরে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ধরে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রামপুর এলাকায় ইসমাঈলের খোঁজ পায় পুলিশ।
তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দাবি করেন, এ ধরনের কোনো মামলা তিনি করেননি। আদালতে উপস্থিত হয়েও তিনি একই বক্তব্য দেন এবং জানান, তাঁর নাম-পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কেউ মামলাটি করেছেন। এজাহারে দেওয়া মোবাইল নম্বরে ফোন করলে এক নারী বলেন, “ইসমাঈল নামে কাউকে চিনি না। আপনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন।”
হাতিরঝিল থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাসেল ইসলামের দাখিল করা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজাহারে অভিযোগ করা ‘বাবু’ নামের কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থল, সাক্ষ্য-প্রমাণ, চিকিৎসকের মতামত, জুলাই নিহতদের সরকারি তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করেও ওই নামে কারও নিহত হওয়ার তথ্য মেলেনি।
এমনকি মামলার সঙ্গে সংযুক্ত মৃত্যুসনদটিও জাল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রকৃত ভুক্তভোগী বা বাদীর অস্তিত্বও তদন্তে পাওয়া যায়নি।
এসব কারণে তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটিকে ‘মিথ্যা’ হিসেবে তুলে ধরে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন এবং এজাহারে নাম থাকা আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা রাসেল ইসলাম বলেন, “তদন্তে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। মামলায় উল্লেখ করা নিহত ব্যক্তি ও বাদী—দুজনের দাবিরই সত্যতা পাওয়া যায়নি। তদন্তে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে একটি চক্র অসৎ উদ্দেশ্যে মামলাটি করেছে।”
মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন বর্তমানে আদালতের বিবেচনায় রয়েছে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ৩রা আগস্ট এ বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য রেখেছে। মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী লুৎফর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
পড়ে গিয়ে কাটাছেঁড়ার দাগকে গুলির দাগ বলে দাবি
২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই বিকেলে রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ২৪ বছর বয়সি পারভেজ আলীর মৃত্যু হয়েছে—এমন অভিযোগে ওই বছরের ২রা সেপ্টেম্বর পল্টন থানায় একটি হত্যা মামলা করেন ইয়াসিন আরাফাত, যিনি নিজেও একই দিন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে দাবি করেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ঘটনাস্থলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ অস্ত্র হাতে গুলি চালান, এবং সে সময় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী ও পুলিশ সদস্যরাও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। মামলায় শেখ হাসিনা, তাপস, পরশসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা এবং পুলিশের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-কে। তদন্তে নেমে পিবিআই এজাহারে অভিযোগ করা গুলিবিদ্ধ ‘নিহত’ পারভেজ আলীর কোনো অস্তিত্ব পায়নি। বাদী ইয়াসিন আরাফাত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন—এই দাবিও সঠিক নয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গত বছরের ১১ই ডিসেম্বর পিবিআই আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানায়, কথিত নিহত ব্যক্তির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, এবং পুরো ঘটনাকে ভিত্তিহীন হিসেবে তুলে ধরে মামলাটিকে মিথ্যা বলে অভিহিত করা হয়।
মামলা নিয়ে জানতে চাইলে প্রথমে বাদী হওয়ার বিষয়টিই অস্বীকার করেন ইয়াসিন আরাফাত। পরে তিনি বলেন, “আমি একটু ব্যস্ত আছি, আপনার সঙ্গে এই বিষয়ে পরে কথা হবে।” পরবর্তীতে তাঁর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর বাবা বিল্লাল হোসেন গাজীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনিও ফোন ধরেননি।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনীমুখা বাজার এলাকায় ইয়াসিন আরাফাতের বাড়িতে খোঁজ নেওয়া হয়। স্থানীয়রা জানান, আরাফাত ও তাঁর বাবা এলাকায় পরিচিত মুখ। বাজারের একাধিক ব্যক্তি জানান, একসময় আরাফাত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের পেছন পেছন ঘুরতেন, মিছিল-সমাবেশে নেতাদের সঙ্গে সেল্ফি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করতেন।
পরবর্তীতে ঢাকা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর তিনি ছাত্র অধিকার পরিষদে যোগ দেন। খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবিরের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন—এমন কোনো তথ্য স্থানীয়দের কেউ দিতে পারেননি।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম মাছুদুল আলম বলেন, “গুলিবিদ্ধ হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। এগুলো সব ভুয়া। তদন্তে পুলিশ এসেছিল, তারাও কোনো প্রমাণ পায়নি। ছেলেটা চতুর, চালু আছে। ওর কোনো কিছুই বিশ্বাসযোগ্য নয়। শুনেছি, এখন ঢাকায় সাংবাদিকতা করে।”
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই মো. মাসুদ রানা বলেন, “কোনো একসময় তার পায়ে আঁচড় লেগে বা পড়ে গিয়ে কাটা-ছেঁড়ার যে দাগ হয়েছিল, সেটিকেই গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্ন হিসেবে দেখিয়ে মামলাটি করা হয়েছিল। সে দাবি করেছে পায়ে গুলি লেগেছিল, অথচ বিষয়টি তার বাবাও জানতেন না। গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবির পক্ষে ইয়াসিন আরাফাত কোনো মেডিকেল সনদও দেখাতে পারেননি।”
পারিবারিক শত্রুরাই আসামি
ইয়াসিন আরাফাত বাদী হয়ে পল্টন থানায় করা এই মামলায় আসামি করা হয়েছে পাবনার আব্দুল মতিন ও নাজমুল হাসানকে, যাঁরা সম্পর্কে চাচা-ভাতিজা এবং পেশায় ট্রাকচালক। তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশ তাঁদের গ্রামের বাড়িতে গেলে তাঁরা প্রথমবারের মতো মামলার বিষয়ে জানতে পারেন এবং অভিযোগ শুনে বিস্মিত হন। বাদী বা কথিত ভুক্তভোগী—কাউকেই তাঁরা চেনেন না বলে জানিয়েছেন।
আব্দুল মতিন বলেন, জুলাইয়ের বিক্ষোভের সময় দেশের অস্থির পরিস্থিতির কারণে পরিবহন চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায় তাঁরা কর্মহীন ছিলেন এবং সে সময় রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে তাঁদের থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
তাঁর ভাষ্যে, “এই বাদী বা যে মারা গেছে বলে বলা হচ্ছে, আমার বাপের জন্মেও তাদের নাম শুনিনি।”
কোনো পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে আসামি হলেন—জানতে চাইলে মতিন বলেন, “পাশের বাড়ির কাশেম মুন্সির সঙ্গে আমাদের জমিজমা নিয়ে বিরোধ আছে। তার ভাতিজা রনি ঢাকায় ক্যামেরাম্যানের চাকরি করে। শুনেছি, বাদী আর রনি দুজনে বন্ধু। তারাই মিলে হয়রানি করার জন্য আমাদের এই মামলায় আসামি করেছে।” এ বিষয়ে রনির বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক মো. মাসুদ রানা বলেন, “আসামিদের ওই দিনের ফোন কলের বিস্তারিত তথ্য (সিডিআর) পর্যালোচনা করে আমরা দেখেছি, তারা ঘটনাস্থলের আশপাশেই ছিলেন না।”
আদাবরের আরেকটি মিথ্যা মামলা
মিথ্যা হিসেবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া আরেকটি হত্যা মামলার তদন্ত করেছে আদাবর থানা পুলিশ। গত বছরের ৩০শে নভেম্বর আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মামলাটিকে মিথ্যা বলে তুলে ধরা হয়েছে। মামলার অভিযোগ, আসামির তালিকা ও এজাহারের ভাষার ক্ষেত্রে হাতিরঝিল ও পল্টন থানার আগের দুটি মামলার সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে।
এই মামলায়ও বাদীর দেওয়া মোবাইল নম্বরটি সঠিক নয় বলে জানা গেছে। নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা ব্যক্তির নাম-পরিচয় ও ঠিকানা অসম্পূর্ণ এবং পরিচয়গত অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। তদন্তে বাদীরও কোনো খোঁজ মেলেনি।
এজাহারে বলা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই আদাবর থানা এলাকায় পুলিশ, আওয়ামী লীগ এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আলী মিয়া নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। এ ঘটনায় মো. তোহা খান বাদী হয়ে মামলা করেন। তদন্তে নেমে ঘটনার সত্যতা পায়নি পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার এসআই তরুণ কুমার বলেন, “তদন্ত শেষে আমরা ঘটনা সত্য নয় বলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছি।”
বাদী তোহা খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে এজাহারে প্রদত্ত মোবাইল নম্বরটি সচল পাওয়া যায়নি। এছাড়া আদাবরের যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, সেখানে গিয়েও তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি। ঠিকানা অনুযায়ী ওই বাড়িতে গেলে বাসিন্দারা জানান, তোহা নামে সেখানে কেউ থাকেন না। উল্টো বাড়ির বাসিন্দারাই জানতে চান, তোহা এখানে থাকেন কি না—এটি জিজ্ঞাসা করার কারণ কী। অর্থাৎ মামলা বা ঘটনা সম্পর্কে আগে কেউ কিছু শোনেননি।
ভুয়া মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়
সাধারণভাবে মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়েরের ঘটনায় বাদীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব বেশি নেই। জুলাই বিক্ষোভকালীন হত্যা বা হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের হওয়া যেসব মামলা তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, সেসব মামলার বাদীদের বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির পাওয়া যায়নি। তাঁরা আদৌ আইনের আওতায় আসবেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “যদি প্রমাণিত হয় যে মামলা ভুয়া, তাহলে দণ্ডবিধির ২১১ ধারার অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। সে ক্ষেত্রে মিথ্যা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব বেশি না হলেও একেবারে যে নেই, তা নয়। জুলাইয়ের মামলাগুলোর শুরুতেই আমরা আশঙ্কা করেছিলাম, এ ধরনের ঘটনাই ঘটবে। এখন তদন্তে ঠিক সেটাই সামনে আসছে।”
মিথ্যা অভিযোগে করা এসব মামলা প্রকৃত মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলবে কি না—জানতে চাইলে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “ফৌজদারি আইনে প্রতিটি মামলা স্বতন্ত্র। অন্য মামলায় কী হয়েছে, সেটি কোনো মামলার বিচার নির্ধারণ করে না। তবে একই ধরনের একাধিক মিথ্যা মামলা সামনে এলে বিচারকদের মানসিকতায় একটি সামগ্রিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। তখন এমন একটি ধারণা জন্মাতে পারে যে, সব অভিযোগই হয়তো সত্য নয়।”
ভুয়া মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো উদ্যোগ আছে কি না—জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “মামলার ভুয়া বাদীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রেও সেটাই হবে। তবে জুলাইকে কেন্দ্র করে হওয়া ভুয়া হত্যা মামলাগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সরকার যদি বিশেষ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি ভিন্ন বিষয়।”




