❐ বিশেষ প্রতিবেদক
এখন আর বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে ইলেকশন হয় না, ইলেকশনকে কেন্দ্র করে জুনিয়র আইনজীবীদের পদচারণায় মুখর হয় না আদালত প্রাঙ্গনগুলো, কিংবা বার কাউন্সিল নির্বাচনে অংশ নেয়া আইনজীবী নেতারা ছুটে যান না বাংলাদেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। সারা দেশের আইনজীবীদের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক ও সনদ প্রদানকারী সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অনুপস্থিত এক গণতান্ত্রিক পরিবেশ।
নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করার পরিবর্তে আবারও সংস্থাটির দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা অ্যাডহক কমিটির হাতে।
গত ৩০শে জুন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১লা জুলাই ২০২৬ থেকে আগামী ৩০শে জুন ২০২৭ পর্যন্ত এক বছরের জন্য ১৫ সদস্যের এই নতুন অ্যাডহক কমিটি বার কাউন্সিল পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে।
পদাধিকার বলে এই কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, যিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার মো. বদরুদ্দোজা বাদল, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, এ এইচ এম মুশফিকুর রহমান তুহিন, ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী, নাসির উদ্দিন অসীম, সরকার তাহমিনা বেগম সন্ধ্যা, অ্যাডভোকেট মো. নাজিম উদ্দিন চৌধুরী, অ্যাডভোকেট আলী আসগর, অ্যাডভোকেট সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সিনিয়র অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান মিলন এবং মোহাম্মদ হোসেন লিপু।
এদের প্রত্যেকেই সরাসরি বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। সাথে আরো আছেন জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিবিদ-আইনজীবী অ্যাডভোকেট জসীম উদ্দীন সরকার ও অ্যাডভোকেট শিশির মনির।
নির্বাচনহীনতার দীর্ঘ পথ
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের আইনজীবীদের এই অভিভাবক সংস্থায় কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এর আগে বারবার অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ বাড়িয়ে বা নতুন কমিটি দিয়ে কোনোমতে এর কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বার কাউন্সিল নির্বাচনের একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা তফসিলের জোরালো ইঙ্গিত দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা স্থগিত করা হয়।
স্থগিতের কারণ হিসেবে এক অদ্ভুত অজুহাতে দেশজুড়ে চলমান ‘জ্বালানি সংকট’-কে সামনে নিয়ে আসা হয়; অথচ আইনজীবীদের ও সাধারণ মহলের মতে, একটি পেশাজীবী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের সঙ্গে জ্বালানি সংকটের দূরদূরান্তের কোনো যৌক্তিক সম্পর্ক ছিল না।
আইনি ব্যত্যয় ও তীব্র সমালোচনা
নির্বাচন না দিয়ে বারবার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অ্যাডহক কমিটি চাপিয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতিকে দেশের প্রথিতযশা আইনবিদ ও মানবাধিকার কর্মীরা ভালো চোখে দেখছেন না। এই মনোনয়ন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও আইনি রীতিনীতি পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছেন অনেকে।
দেশে-বিদেশের আইনজীবীদের মতে, এই মূহূর্তে বার কাউন্সিল নির্বাচন দিলে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের অসাম্প্রদায়িক ও আওয়ামী চেতনার আইনজীবীদের নির্বাচনে ১৪টি পদের সবগুলোতেই নির্বাচিত হবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে – যা হবে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির জন্য চরম অপমানের। এই পরিস্থিতি অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিকভাবে সামলানোর জন্যই দলগুলো জোট বেধে এই প্রজ্ঞাপনটি পাশ করেছে।
এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ ও অ্যাক্টিভিস্ট ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল বলেন, “বার কাউন্সিলে নিয়মিত নির্বাচন না করে বারবার অ্যাডহক কমিটি মনোনীত করার এই চর্চা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক এবং অসাংবিধানিক।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাকটিশনারস অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর আর্টিকেল ৮(২)-তে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মহামারি, অতিমারি, দৈব-দুর্বিপাক (অ্যাক্ট অব গড) কিংবা অন্য কোনো মারাত্মক ও অনিবার্য জরুরি পরিস্থিতির কারণে যদি নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, কেবল তখনই কেবল একটি অন্তর্বর্তীকালীন অ্যাডহক কমিটি গঠন করা যেতে পারে।”
ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল বিএনপি সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনটির দুর্বলতা তুলে ধরে আরও যোগ করেন, “আইনানুযায়ী, এ ধরনের যেকোনো অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপনে বা গেজেট নোটিফিকেশনে সুনির্দিষ্টভাবে সেই বিশেষ বা জরুরি পরিস্থিতির কথা উল্লেখ থাকতে হবে, যার কারণে নির্বাচন করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু বর্তমান সরকার তাদের এই নতুন প্রজ্ঞাপনে কোনোরূপ বিশেষ বা অনিবার্য পরিস্থিতির উল্লেখ করেনি, যা সরাসরি আইনি বিধির লঙ্ঘন। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের অসাম্প্রদায়িক ও আওয়ামী চেতনার আইনজীবীদের এই কমিটিতে না রাখার কারণে, এই কমিটি অংশগ্রহনমূলক হয়নি।
এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের অসাম্প্রদায়িক ও আওয়ামী চেতনার আইনজীবীগন প্রতি পদে পদে বৈষম্যের শিকার হবেন। মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত থাকলে বা সংখ্যালঘু পরিবারের শিক্ষানবীস আইনজীবীদের বার কাউন্সিলের ভাইভা পরীক্ষার সময় বাদ দেয়ার প্রবনতা আগের চেয়ে অনেক বেশী হয়ে যাবে। প্রকাশিত অ্যাডহক কমিটিতে নাম-কা-ওয়াস্তে একজন নারী ও কোনো সংখ্যালঘু প্রতিনিধি না থাকার কারণে, কমিটিটি বৈষম্যমূলকও বটে।”
আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও জাতিসংঘের দলিল
ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বলের মতে, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বার কাউন্সিল শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরীণ আইনের বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি মানদণ্ড। এই আইনজীবীর মতে একটি দেশে যদি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বার কাউন্সিল না থাকে এবং সরকার যদি বারংবার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে, তাহলে আর্ন্তজাতিকভাবে ধরে নেয়া হয় যে, ঐ দেশটিতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিদ্যমান রয়েছে এবং দেশটির বিচার বিভাগ স্বাধীণ নয়।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও আন্তর্জাতিক নীতিমালায় (যেমন— UN Basic Principles on the Role of Lawyers) স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, আইনজীবীদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও গণতান্ত্রিক বার কাউন্সিল থাকা আবশ্যক, যার নেতৃত্ব কোনো সরকারি মনোনয়ন বা সিলেকশনে নয়, বরং আইনজীবীদের প্রত্যক্ষ, অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটাধিকারের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে।
বারবার ঠুনকো অজুহাতে নির্বাচন স্থগিত রাখা এবং একের পর এক অ্যাডহক কমিটি দিয়ে বার কাউন্সিল পরিচালনা করার কারণে দেশের সাধারণ আইনজীবীরা যেমন তাদের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার অংশীজনদের এই প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের আদালত প্রাঙ্গণগুলো আবার কবে নির্বাচনের আমেজে মুখরিত হবে এবং সাধারণ আইনজীবীরা তাদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নিতে পারবেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
