রাজস্ব ঘাটতির চাপ তীব্র, বাড়ছে অর্থ ব্যবস্থাপনার সংকট

রাজস্ব ঘাটতির চাপ তীব্র, বাড়ছে অর্থ ব্যবস্থাপনার সংকট
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের রাজস্ব আদায়ে নতুন রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে রাজস্ব ঘাটতি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রথমবারের মতো ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের আশা করছে। তবে অর্থবছর শেষে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে, যা সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বাড়াতে পারে।

এনবিআরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, অর্থবছর শেষে মোট রাজস্ব আদায় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও এটি সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম।

সংস্থাটির সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুন পর্যন্ত শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর মিলিয়ে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা। জুনের প্রথম ২০ দিনেই আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। মাসের বাকি সময়ে আরও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের সম্ভাবনা দেখছে এনবিআর।
এই ধারা বজায় থাকলে চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো রাজস্ব আদায় ৪ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করবে। একই সঙ্গে এটি আগের অর্থবছরের ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা বেশি হবে।

তবে রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনা থাকলেও ঘাটতির চাপ কমছে না। মে মাস পর্যন্ত প্রথম ১১ মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। ওই সময়েই ঘাটতি দাঁড়ায় ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।

রাজস্ব ঘাটতি সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সরাসরি চাপ তৈরি করে। কারণ, বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধসহ পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ কমানো প্রায় অসম্ভব। ফলে ঘাটতি সামাল দিতে সাধারণত উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হয়, যা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় রাজস্ব কাঠামো দুর্বল রয়ে গেছে। মোস্তাফিজুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর বিশেষ ফেলো, বলেন—অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কারণে বড় ঘাটতি এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। করের আওতা বাড়ানো ছাড়া এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কঠিন।

একই মত দিয়েছেন জাহিদ হোসেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, করের আওতা সম্প্রসারণ ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া রাজস্ব আয় টেকসইভাবে বাড়ানো সম্ভব নয়।

এদিকে শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর—তিন খাতেই প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। মে পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ০২ শতাংশ।

রাজস্ব বাড়াতে এনবিআর ইতিমধ্যে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর ও শুল্ক বিভাগে তিনটি পৃথক কর্মদল গঠন করেছে। মামলা নিষ্পত্তি, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এসব কর্মদল কাজ করছে। পাশাপাশি কর ফাঁকি শনাক্তকরণ, উৎসে কর তদারকি, আমদানি-পরবর্তী নিরীক্ষা এবং ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে এনবিআরের ওপরই পড়বে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব। ফলে চলতি বছর রাজস্ব আদায়ে নতুন রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনা থাকলেও সামনে অর্থ ব্যবস্থাপনার চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

Visited 5 times, 1 visit(s) today