ড. লুবনা ফেরদৌসী | শিক্ষক ও গবেষক
প্রথমে ভেবেছিলাম, এসব বিষয় নিয়ে লিখব না। কয়েকজন ছেলে-পেলে Oxford Union এ গিয়ে দুটো কথা বললো, তারপর সেটাকে এমনভাবে প্রচার করলো যেন জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভাষণ দিয়ে এসেছে, এসব নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই।
Oxford Union মূলত একটা debating society, যুক্তরাজ্যের অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক debating union এর একটি। এমনকি ২০২৬ সালের Whatuni Student Choice Awards এর Student Union জরিপে এটা টপ টেনের মধ্যেও নেই। তার ওপর আলোচ্য অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে Oxford Bangla Society। সেখানে বক্তৃতা দেওয়া নিঃসন্দেহে একটা অভিজ্ঞতা হতে পারে, কিন্তু এটা কোনো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক মহত্ত্বের সনদ না, বা এটাকে জাতীয় প্রতিনিধিত্বের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
কিন্তু যেটা আমাকে লিখতে বাধ্য করেছে, সেটা হলো এই পুরো ঘটনাকে “subaltern politics” এর ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা।
বিশেষ করে যখন একজন শিক্ষিত গবেষক বলেন, “The problem isn’t Can the Subaltern Speak? Innalillah, the subaltern is speaking,” তখন একজন feminist scholar এবং postcolonial theory নিয়ে কাজ করা একজন গবেষক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, কিছু কথা বলা জরুরি।
কারণ সমস্যাটা হলো, সাবঅল্টার্ন ধারণাটিকে রাজনৈতিকভাবে হাইজ্যাক করা। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের বিখ্যাত প্রশ্ন ছিল, “Can the Subaltern Speak?”
দুঃখজনকভাবে, উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের ইতিহাসে এটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত, আবার সবচেয়ে বেশি ভুলভাবে ব্যবহৃত ধারণাগুলোর একটি।
স্পিভাক কখনো জানতে চাননি গ্রামের ছেলে ইংরেজিতে কথা বলতে পারে কি না, কিংবা মাদ্রাসার ছাত্র অক্সফোর্ডে বক্তৃতা দিতে পারে কি না। তাঁর প্রশ্ন ছিল আরও অনেক বেশি অস্বস্তিকর। কারা বৈধ বক্তা হিসেবে স্বীকৃতি পায়? কার জ্ঞানকে জ্ঞান হিসেবে গণ্য করা হয়? কারা ইতিহাস লেখে? কারা অন্যের হয়ে কথা বলে? আর কারা কথা বললেও তাদের কথা শোনা হয় না?
স্পিভাকের “সাবঅল্টার্ন” মূলত এমন এক অবস্থান, যেখানে মানুষ সামাজিক গতিশীলতার সব পথ থেকে বিচ্ছিন্ন; যেখানে তার কণ্ঠস্বর প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামোয় প্রবেশ করতে পারে না। সাবঅল্টার্ন মানে শুধু দরিদ্র না, সাবঅল্টার্ন মানে এমন মানুষ, যার বক্তব্যকে জ্ঞান, নীতি, ইতিহাস বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পর্যায়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
এই কারণেই তিনি বলেছিলেন, সমস্যাটা কথা বলার সক্ষমতার নয়; সমস্যাটা হলো, কেউ শুনছে কি না।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র, সংসদ সদস্য, ডাকসুর সাবেক ভিপি, জাতীয় গণমাধ্যমে নিয়মিত উপস্থিত ব্যক্তি, লাখ লাখ অনুসারীসম্পন্ন রাজনৈতিক কর্মী, আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমন্ত্রিত বক্তা, সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতিনিধি, তাঁদেরকে কি সত্যিই সাবঅল্টার্ন বলা যায়?
যারা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে, যাদের বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়, যাদের রাজনৈতিক সংগঠন আছে, অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক আছে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আছে, তারা যদি নিজেদের সাবঅল্টার্ন ঘোষণা করে, তাহলে “সাবঅল্টার্ন” শব্দটির আর কোনো বিশ্লেষণাত্মক মূল্যই অবশিষ্ট থাকে না। এটা আর তবে তত্ত্ব থাকে না, এটা হয়ে যায় political branding।
আরও স্পষ্ট করে বললে, এটা victimhood as capital. এটাই প্রান্তিকতার ভাষাকে রাজনৈতিক মূলধনে রূপান্তরিত করার কৌশল; privilege কে persecution হিসেবে বাজারজাত করার এক ধরনের রাজনৈতিক অভিনয়।
বাংলাদেশে জামায়াতকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই একটি বড় ভুল করি। আমরা ধরে নিই, জামায়াত শুধুই মসজিদ-মাদ্রাসাভিত্তিক একটি সংগঠন। বাস্তবতা আরও জটিল। দীর্ঘদিন ধরে তারা পরিকল্পিতভাবে মেধাবী তরুণদের চিহ্নিত করে, উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ করে, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী পরিসরে প্রবেশের উপযোগী করে তোলে।
লীগ, বিএনপি বা অন্যান্য দলও নিবেদিত কর্মী তৈরি করেছে, কিন্তু জ্ঞান উৎপাদনকে রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে দেখা, মেধাকে দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক বিনিয়োগে রূপান্তর করা, এবং সংগঠনের প্রতি এমন নৈতিক আনুগত্য গড়ে তোলা, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে বৃহত্তর একটি আদর্শিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে কল্পনা করে, সে অর্থে জামায়াত প্রায় অদ্বিতীয়।
তারা শুধু সমর্থক তৈরি করে না, তারা এমন ক্যাডার তৈরি করে, যারা সংগঠনের জন্য ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সামাজিক স্বীকৃতি, এমনকি প্রয়োজন হলে নিজের জীবনও ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত থাকে, যাকে political sociology বলে, “dedicated cadres willing to make the ultimate sacrifice”।
হয়তো এ কারণেই তারা অনেক আগেই বুঝেছিল যে ক্ষমতা শুধু সংসদ বা রাজপথের দখল দিয়ে টিকে থাকে না। ক্ষমতা উৎপন্ন হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে, গবেষণাগারে, থিংক ট্যাঙ্কে, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে, মানবাধিকার রিপোর্টে, উন্নয়ন প্রকল্পের ভাষায়, এমনকি কোন জ্ঞানকে “নিরপেক্ষ” এবং কোন বয়ানকে “বৈধ” বলে গণ্য করা হবে, সেই সিদ্ধান্তের মধ্যেও। অন্য কথায়, রাষ্ট্র দখলের আগেই ন্যারেটিভ দখল করতে হয়; রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আগে জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করি।
২০১৩ সালে আমি তখন Hull University এর শিক্ষার্থী। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। একদিন আমার supervisor আমাকে faculty seminar series আয়োজনের দলে যোগ দিতে বললেন। আমি খুবই উৎসাহিত হয়েছিলাম। বক্তাদের তালিকায় দেখলাম, লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন white British professor বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করবেন। আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম।
কিন্তু কনফারেন্সের দিন তাঁর উপস্থাপনা শুনে আমি বিস্মিত হয়ে যাই। তিনি মূলত জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানকেই academic ভাষায় পুনরুৎপাদন করছিলেন, বিচার রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ হয়নি, ইত্যাদি। আমি যখন বাংলাদেশী হিসেবে আমার পরিচয় দিলাম, উনি, একটু চমকে উঠলেন, চোখ বড় করে ফেললেন, বললেন “তা হলে তো আপনার ভালো জানার কথা পুরো বিষয়টি।”আমি বললাম, এ কারণেই অবাক হচ্ছি।
আমার বয়স কম তখন অতোটা রাজনীতি বুঝতাম না, গবেষণার জ্ঞান থেকে কয়েকটা প্রশ্ন করেছিলাম:
আপনার এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কী ধরনের first-hand research রয়েছে? কোন historical এবং contextual evidence ব্যবহার করেছেন? কোন survivor testimony, কোন archival source, কোন স্থানীয় গবেষণা?
তিনি সরাসরি উত্তর দিতে পারেননি। প্রশ্ন এড়িয়ে অন্যদিকে চলে গিয়েছিলেন। তখন রাজনীতি নিয়ে আমার পড়াশোনা এত গভীর ছিল না। পরে জেনেছি, আন্তর্জাতিক পরিসরে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে delegitimise করার জন্য কত বিপুল অর্থ, lobbying, গবেষণা, policy paper, seminar, conference এবং publication ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই কারণেই “সাবঅল্টার্ন” শব্দের এই ব্যবহার আমাকে উদ্বিগ্ন করে। নৃবিজ্ঞানী Sayema Khatun এই ঘটনাকে খুব শক্তিশালীভাবে বর্ণনা করেছেন, “Subaltern is hijacked.”
আমার কাছে এই কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।
স্পিভাক নিজেই সতর্ক করেছিলেন যে, সবচেয়ে বড় বিপদ ঘটে তখন, যখন ক্ষমতাবানরা প্রান্তিকের হয়ে কথা বলতে গিয়ে তাদের কণ্ঠস্বর দখল করে নেয়।
আজকে সেটাই হচ্ছে, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষ নিজেরাই প্রান্তিকের পরিচয় ধারণ করছে। যারা ইতোমধ্যে মাইক্রোফোনের মালিক, তারা নিজেদের নিঃশব্দ বলে ঘোষণা করছে। যারা জাতীয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়, তারা নিজেদের অশ্রুত বলে পরিচয় দিচ্ছে। যারা নীতিনির্ধারণী দরজায় প্রবেশ করতে পারে, তারা নিজেদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ফলে আসল সাবঅল্টার্নরা আবারও অদৃশ্য হয়ে যায়। খাগড়াছড়ির সেই আদিবাসী নারী, যার জমি দখল হয়েছে।
উপকূলের সেই জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার। চা-বাগানের সেই শ্রমিক নারী। গার্মেন্টস শ্রমিক, যার নাম কোনো নীতিপত্রে নেই। রোহিঙ্গা শিবিরের সেই কিশোরী, যার জীবনের সিদ্ধান্ত নেয় অন্যরা। তাদের কণ্ঠস্বরকে প্রতিনিধিত্ব করার বদলে, তাদের পরিচয়টুকুও যদি রাজনৈতিক অভিজাতরা ধার করে নেয়, তাহলে স্পিভাকের প্রশ্ন নতুনভাবে ফিরে আসে।
Oxford Union এ বক্তৃতা দেওয়া নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি আছে তত্ত্বকে স্লোগানে নামিয়ে আনার বিরুদ্ধে। আপত্তি আছে প্রান্তিকতার ভাষাকে রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত করার বিরুদ্ধে।আপত্তি আছে সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক অসততার বিরুদ্ধে, যেখানে privilege নিজেকে persecution হিসেবে বাজারজাত করে।
এই কারণেই মানবাধিকার, উন্নয়ন, গণতন্ত্র, জেন্ডার ন্যায়বিচার কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচারের ভাষাগুলোকে সরল নৈতিক অভিধান হিসেবে পড়লে ভুল হবে। এগুলো আর খালি মুক্তির ভাষা না, এগুলো এখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র, এগুলোর ভেতরেও ক্ষমতার লড়াই চলে। কে নিপীড়িত, কে প্রতিনিধিত্ব করবে, কার কষ্ট দৃশ্যমান হবে, কার বেদনা রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করবে, এসব প্রশ্নের উত্তর কখনো নিরপেক্ষভাবে নির্ধারিত হয় না।
সাবঅল্টার্নের ভাষা যখন ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থানকারীরা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের জন্য ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে: আমরা কি সত্যিই প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর শুনছি, নাকি প্রান্তিকতার নৈতিক মর্যাদাকেই নতুন এক রাজনৈতিক পুঁজিতে রূপান্তরিত হতে দেখছি?
স্পিভাকের প্রশ্নের সমকালীন উত্তর এটাই,
The subaltern is not suddenly speaking. Inna lillah, the subaltern is being renamed. And once again, being spoken over.
