❐ বিশেষ প্রতিবেদক
তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদের ভাটি অঞ্চলে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধের নির্মাণ কাজ শুরু করেছে চীন। এই ইয়ারলুং সাংপো নদই ভারতে সিয়াং এবং বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়—যার অর্থ, এই নদীকেন্দ্রিক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশের ওপরও।
অরুণাচল সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার এই ‘মেডোগ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের’ বিপরীতে ভারত নিয়েছে ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্টের’ পরিকল্পনা।
ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত এনএইচপিসির অধীনে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা ১১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার এই মেগা বাঁধ হবে ভারতের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। আনুমানিক ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১.৫ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপন্নের আশা করা হচ্ছে।
তবে এই দুই প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
চীনের ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার মেডোগ প্রকল্পের কাজ পূর্ণ গতিতে চললেও ভারতের ১১ হাজার মেগাওয়াটের ‘সাম্প’ প্রকল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই আটকে রয়েছে।
এই ব্যবধান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরছে—উজানে চীন যদি আগেভাগে তার বিশাল বাঁধ সম্পন্ন করে ফেলে এবং ভারত পিছিয়ে থাকে, তাহলে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে কার্যত একতরফা সুবিধা পেয়ে যাবে বেইজিং—যার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত থাকবে না।
ইয়ারলুং সাংপো নদটি অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং নদী হিসেবে প্রবেশ করে আসাম ও বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যা এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবনরেখা।
অর্থাৎ, তিব্বত থেকে শুরু হওয়া এই একটি নদীর ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তিনটি দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা—এবং এই নদীকে নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে বাংলাদেশের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই, যদিও সবচেয়ে ভাটিতে থাকার কারণে চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে এই দেশেই।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, চীনের এই বিশাল বাঁধের ফলে উজান থেকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হওয়া, কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়া এবং ভাটি অঞ্চলে অনাকাঙ্ক্ষিত ও আকস্মিক বন্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি দ্বিগুণ—একদিকে চীনের বাঁধ, অন্যদিকে ভারতের পরিকল্পিত বাঁধ—দুটিই একই নদীর প্রবাহকে প্রভাবিত করবে, যার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, তারা ব্রহ্মপুত্র নদ অববাহিকার সব ধরনের কর্মকাণ্ড এবং চীনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর সতর্ক নজর রাখছে।
বেইজিংয়ের এই একতরফা নদী প্রকল্পের বিপরীতে ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে নয়াদিল্লি।
তবে এই অঙ্গীকার মূলত ভারতের নিজ ভূখণ্ড ও স্বার্থ রক্ষাকে ঘিরে; বাংলাদেশের মতো আরও ভাটির দেশের স্বার্থ এই দ্বিপাক্ষিক হিসাব-নিকাশে কতটা গুরুত্ব পাবে, তা স্পষ্ট নয়।
নদী প্রকল্পের বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, পানি সংক্রান্ত তথ্য বিনিময় এবং পারস্পরিক আলোচনার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে বারবার চীনকে চাপ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তার ফল পাওয়া যায়নি।
চীন ও ভারতের মধ্যে এই দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েনে বাংলাদেশ কোনো পক্ষ না হলেও, নদীর সবচেয়ে নিচের প্রান্তে অবস্থানের কারণে দুই দেশের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ প্রভাব এড়ানো বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
উজানে দুটি বিশাল বাঁধ নির্মিত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং বর্ষায় আকস্মিক ছাড়া পানিতে বন্যার ঝুঁকি—এই দুই বিপরীতমুখী সংকটেই পড়তে পারে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার বাংলাদেশি অংশ, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে দেশের কৃষি, মৎস্য সম্পদ ও লাখো মানুষের জীবিকার ওপর।
