বিশেষ প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম, ১৬ জুন ২০২৬
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত, গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত, মামলার আসামি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন আহমেদ এখন জাতীয় সংসদের সদস্য। চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনে গত ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে ৭৬ হাজার ৪৯৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগেই তাঁর বিরুদ্ধে জারি হয়েছিল গ্রেফতারি পরোয়ানা।
দুবাইয়ে বেনজীরকে আটকাতে তথ্য দিয়েছিলেন জসিমই
সূত্র জানাচ্ছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে পালিয়ে থাকা সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে আটকের ক্ষেত্রে তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক অংশীদার জসিম উদ্দিনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। অর্থাৎ যে সহযোগীর সাথে মিলে বছরের পর বছর অবৈধ অর্থ লেনদেন করেছেন বলে অভিযোগ, সেই সহযোগীর দেওয়া তথ্যেই ধরা পড়েন বেনজীর।
যেভাবে উঠে এসেছেন জসিম
চন্দনাইশের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বিএনপির নেতা-কর্মীদের অনেকে তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সখ্যের অভিযোগ তুলেছিলেন।
পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীরের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত জসিম উদ্দিন চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে একাধিক বাড়ি ও ৪৪টি ফ্ল্যাটের মালিক। দেড় বছরের ব্যবধানে তাঁর সম্পদ ২১ কোটি থেকে বেড়ে ৪১ কোটি টাকার ঘরে পৌঁছেছে এবং এই সময়ে তিনি ৬০ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণও পরিশোধ করেছেন।
আওয়ামীলীগের আমলে ২০২৪ সালের ১০ই জুলাই ১১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ এর অভিযোগে এই উপজেলা চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় আদালত। এর আগেও ৩০ এপ্রিল রামদা হোটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জেসিকা গ্রুপের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে আদালত।
গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি আদালত বাড্ডা থানায় দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলায় জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। ওই মামলায় আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের পাশাপাশি ২১ নম্বর আসামি হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে। ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়।
মনোনয়ন নিয়ে দলের মধ্যেই ক্ষোভ
ধানের শীষ প্রতীকে জসিম উদ্দিনের মনোনয়ন পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে অস্বস্তি ও ক্ষোভ তৈরি হয়। চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন স্বীকার করেন, দলে জসিমের কোনো পদ নেই। তবুও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন বাতিল হয়নি।
প্রাথমিকভাবে তাঁর মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হলেও অবশেষে তা বৈধ ঘোষণা করা হয়।
যে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে
গ্রেফতারি পরোয়ানা, হত্যাচেষ্টা মামলা, বেনজীরের ক্যাশিয়ারের অভিযোগ এবং দলে কোনো পদ না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে জসিম উদ্দিন বিএনপির মনোনয়ন পেলেন এবং এমপি হলেন — এই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামীলীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তীতে বিএনপিকে ‘ম্যানেজ’ করার সক্ষমতাই তাঁকে এই অসম্ভব যাত্রায় সফল করেছে। দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার নিয়ে যে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তার মনোনয়নে বেনজীরের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর স্থান পাওয়া সেই অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
