এসএএম ইঞ্জিন: ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার নতুন পণ্য, যার নেই কোন বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি

এসএএম ইঞ্জিন: ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার নতুন পণ্য, যার নেই কোন বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

ঢাকা, ১৫ জুন ২০২৬

নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে ‘সাবেত অ্যাডভান্সড মোটর’ (SAM Engine) নামে একটি নতুন ধরনের রোটারি পিস্টন ইঞ্জিন বাংলাদেশসহ দরিদ্র দেশগুলোতে চালু করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইউনিস সেন্টারের ফেসবুক পেইজ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই ইঞ্জিন খুব সহজ, কম খরচের এবং দরিদ্র মানুষের জন্য উপযোগী হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই ইঞ্জিনের বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি ও স্বাধীন পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাব নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।

ইউনূস সেন্টারের মতে, SAM ইঞ্জিনের পেছনে সাবেত ভাইদের দীর্ঘদিনের পেটেন্ট রয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিশ্বের স্বীকৃত কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং জার্নাল, SAE (Society of Automotive Engineers), ASME কিংবা কোনো স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে এই ইঞ্জিনের থার্মাল এফিসিয়েন্সি, নির্গমন (emission), দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা, জ্বালানি খরচ কিংবা বাস্তব কর্মক্ষমতা নিয়ে কোনো পিয়ার-রিভিউড গবেষণা বা ডায়নো টেস্টের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।

আন্তর্জাতিক অটোমোটিভ শিল্প ও ইঞ্জিনিয়ারিং কমিউনিটিতে এই ইঞ্জিন সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য আলোচনা বা স্বীকৃতি নেই।

একজন বাংলাদেশি যান্ত্রিক প্রকৌশলী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “নতুন ইঞ্জিন ডিজাইনের ক্ষেত্রে সিলিং, ভাইব্রেশন, তাপ ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এগুলো ছাড়া শুধু দাবির ভিত্তিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দিলে ঝুঁকি অনেক বেশি।”

দরিদ্র মানুষের ওপর পরীক্ষা?

ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে এই ইঞ্জিনকে ছোটখাটো জেনারেটর, পাম্প ও যানবাহনের জন্য প্রচার করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে—যে প্রযুক্তি আন্তর্জাতিকভাবে এখনো পরীক্ষিত ও প্রমাণিত নয়, তা সরাসরি বাংলাদেশের গ্রামীণ ও দরিদ্র এলাকায় চালু করার উদ্দেশ্য কী? এতে যদি ইঞ্জিন ব্যর্থ হয়, অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হয় কিংবা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সবচেয়ে দুর্বল মানুষেরা, যাদের কোনো অভিযোগ করারও সামর্থ্য নেই।

সবচেয়ে বড় যেই প্রশ্ন তুলছেন পুরকৌশলীরা, সেটা হচ্ছে, কোন রকম ল্যাবটেস্ট ও ক্লিয়ারেন্স ছাড়া উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে কি এমন প্রযুক্তি বাজারজাত করা সম্ভব হতো?

ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন ইঞ্জিন বাজারে আনার আগে সাধারণত স্বাধীন ল্যাব টেস্ট, ফিল্ড ট্রায়াল এবং সার্টিফিকেশন (যেমন ISO, EPA বা সমতুল্য) প্রয়োজন। SAM ইঞ্জিনের ক্ষেত্রে এসবের কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ্যে নেই।

ড. ইউনূসের ‘ইউনুস সেন্টার’ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটি দরিদ্রদের জন্য সস্তা ও সহজ প্রযুক্তি। কিন্তু সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন—দরিদ্রদের জন্য কি অপরীক্ষিত প্রযুক্তিই যথেষ্ট? নাকি তাদেরও বিশ্বমানের পরীক্ষিত প্রযুক্তির অধিকার রয়েছে?

স্বচ্ছতার দাবি

বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের একাংশ SAM ইঞ্জিন প্রকল্প নিয়ে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়ন, পাবলিক ডেটা প্রকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফিল্ড টেস্টের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ভালো উদ্দেশ্য থাকলেও বৈজ্ঞানিক সতর্কতা ও নৈতিক দায়িত্ব উপেক্ষা করা উচিত নয়।

ড. ইউনূস ও সাবেত পরিবারের কাছে এ বিষয়ে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে বিভিন্ন মহল। SAM ইঞ্জিন সত্যিই দরিদ্রদের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হবে, নাকি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উপর আরেকটা ফিল্ড টেস্ট হবে—সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে শুরুতেই স্বচ্ছতা ও স্বাধীন যাচাই না করলে এই উদ্যোগ নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়তে পারে।

Visited 40 times, 1 visit(s) today