সোশ্যাল মিডিয়ার আগ্রাসন থেকে শিশুদের রক্ষায় ব্রিটেনের কঠোর আইন — বাংলাদেশ কি শিক্ষা নেবে?

সোশ্যাল মিডিয়ার আগ্রাসন থেকে শিশুদের রক্ষায় ব্রিটেনের কঠোর আইন — বাংলাদেশ কি শিক্ষা নেবে?
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

ঢাকা, ১৫ জুন ২০২৬

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের কম বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে। একই সাথে গেমিং ও লাইভস্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ওপরেও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। এ বছরের শেষ নাগাদ পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা জারির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। স্টারমার বলেন, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্ষমতা সংকুচিত করতেই এই পদক্ষেপ।

যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে এবং স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে — বাংলাদেশ কি একই পথে হাঁটবে?

 

সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে শিশুদের ক্ষতি করছে

গবেষণা বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা ও একাকীত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের অ্যালগরিদম এমনভাবে ডিজাইন করা যে শিশুরা একবার প্রবেশ করলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে।

ক্ষতির ধরনগুলো কয়েকটি ভাগে দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি। পরিপূর্ণ জীবনযাপনের মিথ্যা চিত্র দেখতে দেখতে শিশুরা নিজেদের জীবন নিয়ে হতাশায় ডুবে যাচ্ছে। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেকে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হচ্ছে, এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, পড়াশোনায় বিপর্যয়। রাত জেগে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করার অভ্যাসে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে, মনোযোগ কমছে। স্কুলের পাঠ্যবইয়ের চেয়ে রিলস ও শর্ট ভিডিও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

তৃতীয়ত, ক্ষতিকর কন্টেন্টের সংস্পর্শ। যৌন সহিংসতা, মাদকাসক্তি, উগ্রবাদী মতাদর্শ এবং বিপজ্জনক ‘চ্যালেঞ্জ’ ভিডিও — এসব কন্টেন্ট শিশুদের কাছে অবাধে পৌঁছে যাচ্ছে।

চতুর্থত, বাস্তব সম্পর্কের অবনতি। পরিবারের সাথে সময় কাটানোর বদলে ফোনের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে থাকা শিশুদের পারিবারিক বন্ধন দুর্বল করছে।

 

বাংলাদেশের চিত্র: উদ্বেগজনক বাস্তবতা

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। স্মার্টফোনের দাম কমে আসায় এবং সাশ্রয়ী ডেটা প্যাকেজের সুবাদে প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন শিশুরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। শহরের স্কুলগুলোতে শিক্ষকরা বলছেন, করোনা মহামারির পর থেকে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অনেক শিক্ষক লক্ষ্য করছেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা ফোনে মগ্ন থাকছে।

বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য বলছে, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক সমস্যার হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সাইবার বুলিং, অনলাইন যৌন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়া শিশুর সংখ্যাও বছর বছর বাড়ছে।

 

অন্য দেশগুলো কী করছে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসেছে। অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করেছে। ফ্রান্স ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতি বাধ্যতামূলক করেছে। নরওয়ে ১৫ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের পরিকল্পনা করছে। এখন সর্বশেষ যোগ দিল যুক্তরাজ্য।

 

বাংলাদেশে কী করা সম্ভব

বাংলাদেশে এই ধরনের আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জের। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু পদক্ষেপ এখনই নেওয়া সম্ভব।

আইনি কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে সাইবার সুরক্ষা আইনে শিশুদের জন্য বিশেষ বিধান রাখা যায়। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে বয়স যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা দেওয়া এবং অনলাইনে শিশু সুরক্ষায় স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রক কাঠামো গঠন করা জরুরি।

সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে স্কুলপাঠ্যক্রমে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সোশ্যাল মিডিয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। পাশাপাশি অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতন করার কার্যক্রম নেওয়া প্রয়োজন।

প্রযুক্তিগত সমাধানের দিক থেকে ইন্টারনেট সেবাদাতাদের মাধ্যমে শিশুবান্ধব ফিল্টারিং ব্যবস্থা চালু করা এবং শিশুদের ডিভাইসে স্ক্রিন টাইম সীমিত রাখার অ্যাপ বাধ্যতামূলক করার সুযোগ রয়েছে।

 

যুক্তরাজ্যের মতো একটি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ যখন সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারে, তখন বাংলাদেশেরও ভাবার সময় এসেছে। প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়া আর প্রযুক্তির ক্ষতির কাছে শিশুদের অসহায় ছেড়ে দেওয়া এক কথা নয়। আগামী প্রজন্মকে সুস্থ, মানসিকভাবে শক্তিশালী ও সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হলে ডিজিটাল পরিবেশকে শিশুবান্ধব করার কোনো বিকল্প নেই।

প্রশ্নটা কেবল এই নয় যে বাংলাদেশ পারবে কিনা। প্রশ্নটা হলো — দেরি করলে কতটা ক্ষতি আরও হবে?

Visited 8 times, 1 visit(s) today