বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা, ১৪ জুন ২০২৬
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষা ফি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শনিবার (১৩ জুন) বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের এক সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তৃতীয় শ্রেণির জন্য ৩০ টাকা, চতুর্থ শ্রেণির জন্য ৪০ টাকা এবং পঞ্চম শ্রেণির জন্য ৫০ টাকা পরীক্ষা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
সচিব জানান, বর্তমানে বিদ্যালয়গুলোকে দেওয়া স্লিপ বরাদ্দ দিয়ে পরীক্ষা আয়োজনের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সময় শিক্ষকদের নিজেদের পকেট থেকে অর্থ ব্যয় করতে হয়। সেই চাপ কমাতেই এই উদ্যোগ।
যে প্রশ্ন উঠছে
সরকারের এই সিদ্ধান্তে শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মূল প্রশ্ন — যে শিক্ষাব্যবস্থা মূলত দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের সন্তানদের জন্য তৈরি, সেখানে ফি আরোপ করলে কতটা ক্ষতি হবে?
বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশই দিনমজুর, কৃষক ও নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তান। যে পরিবারে দৈনন্দিন খাবারের জোগান দেওয়াই কঠিন, সেই পরিবারের শিশুকে প্রতি পরীক্ষায় ৩০ থেকে ৫০ টাকা দিতে বললে তা ছোট মনে হলেও বাস্তবে অনেক পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে ‘অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক’ ঘোষণা করা হয়েছে। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বাধ্য। এই প্রেক্ষাপটে পরীক্ষা ফি আরোপের সিদ্ধান্তটি সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা, সেই প্রশ্নও উঠছে।
ঝরে পড়ার আশঙ্কা
বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার এখনো উদ্বেগজনক। ইউনিসেফ ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, অর্থনৈতিক কারণেই বেশিরভাগ শিশু স্কুল ছেড়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষা ফি চালু হলে আরও বেশি শিশু ঝরে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষা গবেষকরা। বিশেষত হাওর, চর ও পাহাড়ি অঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায় এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে।
সচিবের যুক্তি
সচিব সাখাওয়াত হোসেন অবশ্য বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি নিজেই ব্যাখ্যা দেবেন। তাঁর মতে, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর চেয়ে বেশি হারে পরীক্ষা ফি নেওয়ার নজির রয়েছে। তবে সমালোচকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তুলনা চলে না — কারণ এই বিদ্যালয়গুলোর অস্তিত্বই সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র শিশুদের জন্য।
বিকল্প পথ কি ছিল না?
প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষকদের আর্থিক চাপ কমাতে কি শুধু পরীক্ষা ফিই একমাত্র সমাধান ছিল? সরকার চাইলে বিদ্যালয়গুলোর স্লিপ বরাদ্দ বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে পারত। এমনকি সচিব নিজেই জানিয়েছেন আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে — তাহলে তার আগেই কেন শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ চাপানো হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
শিক্ষা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। তারা বলছেন, শিক্ষকের সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে শিশুর অধিকারকে বলি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
