অন্ধকারে ডুবছে পর্যটন নগরী: লাগাতার লোডশেডিংয়ে কক্সবাজার ছাড়ছেন পর্যটকেরা, হোটেল ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত

অন্ধকারে ডুবছে পর্যটন নগরী: লাগাতার লোডশেডিংয়ে কক্সবাজার ছাড়ছেন পর্যটকেরা, হোটেল ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত
শেয়ার করুন

কক্সবাজার প্রতিনিধি

 

পবিত্র ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রতি বছরের মতো এবারও লাখো পর্যটকের পদচারণে মুখর হয়ে উঠেছিল বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। কিন্তু চলতি বছর সৈকতের নোনা জলের আনন্দের পাশাপাশি পর্যটকদের সঙ্গী হয়েছে এক দুঃসহ দুর্ভোগ— লাগাতার ও দীর্ঘমেয়াদী লোডশেডিং। শহরের কলাতলী সাবস্টেশনের একটি প্রধান পাওয়ার ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিন অন্তত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে না পর্যটন জোন। এই চরম বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জেরে ইতিমধ্যে অন্তত ৩০ হাজার পর্যটক হোটেলের বুকিং বাতিল করে কক্সবাজার ছেড়েছেন। অন্যদিকে, বাড়তি জ্বালানি খরচ মেটাতে গিয়ে তীব্র আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন হোটেল ব্যবসায়ীরা।

 

​বিয়ের আসর ও লিফটে রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা: ক্ষুব্ধ পর্যটকেরা

​কক্সবাজারের কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনে পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস, কটেজ ও রিসোর্ট রয়েছে, যেখানে একসঙ্গে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার পর্যটকের আবাসন সম্ভব। ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে এখানে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও বিদ্যুতের অভাবে স্বাভাবিক সেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

​নারায়ণগঞ্জ থেকে সপরিবারে আসা পর্যটক মো. ইব্রাহিম জানান এক রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তাঁর পরিবারের সদস্যরা হোটেলের লিফটে প্রায় ২০ মিনিট আটকে ছিলেন। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ​”একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে এমন বিদ্যুৎ বিভ্রাট চরম হতাশাজনক। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, তা আমরা কল্পনাও করিনি।”

​ঢাকার ফকিরাপুল থেকে আসা আরেক পর্যটক আবদুস সামাদ আক্ষেপ করে বলেন, বাইরে তীব্র গরম থেকে ঘুরে এসে হোটেলেও শান্তি নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় এসি কিংবা ফ্যান কোনোটিই ঠিকমতো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

 

কক্সবাজার বিদ্যুৎ সংকট: এক নজরে

• দৈনিক লোডশেডিং: ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা

• বুকিং বাতিল: ৩০,০০০+ পর্যটক

• দৈনিক জেনারেটর খরচ (প্রতি হোটেল): ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা (ডিজেল)

• বর্তমান ঘাটতি: ১০ মেগাওয়াট (চাহিদা ৫০ মেগাওয়াট, সরবরাহ ৪০ মেগাওয়াট)

ডিজেলের পেছনে দৈনিক ৩০ হাজার টাকা: দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে হোটেল মালিকদের

​কলাতলী সৈকত এলাকার হোটেল সি ক্রাউনের ব্যবস্থাপক সাজ্জাদ হোসেন জানান, পর্যটকদের সন্তুষ্ট রাখতে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে হোটেলের পরিচালন ব্যয় মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

​একই সুর শোনা গেল হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলীর কণ্ঠেও। তিনি জানান, ঈদের পরদিন থেকে শুরু হওয়া এই সংকটের কারণে প্রতিদিন শুধু জেনারেটরের ডিজেল কিনতেই তাঁদের ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে।

​কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান এবং হোটেল-মোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার যৌথভাবে জানান, আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে কক্সবাজারের ভাবমূর্তির। পর্যটকেরা যদি এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা ও দুর্ভোগ নিয়ে ফিরে যান, তবে।তার দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পুরো দেশের পর্যটন শিল্পের ওপর পড়বে।

 

​পিডিবি যা বলছে: কখন স্বাভাবিক হবে পরিস্থিতি?

​কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শহর ও হোটেল-মোটেল জোনে প্রতিদিন প্রায় ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সাবস্টেশন সংকটের কারণে বর্তমানে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট। ঈদের দিন ভোরে কলাতলী সাবস্টেশনের পাওয়ার ট্রান্সফরমারটি বিকল হওয়ার পর থেকে এই ১০ মেগাওয়াটের স্থায়ী ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
​পিডিবির সহকারী প্রকৌশলী বাবুল মিয়া জানান, বিকল ট্রান্সফরমারের লোড অন্য দুটি ট্রান্সফরমারে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে পুরোনো ট্রান্সফরমারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় সেগুলোও বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যার কারণে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

​বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজার বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাদের গণী আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, বিকল ট্রান্সফরমারটি সচল করার কাজ একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আজ রোববার দিন-রাত কাজ চলছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামীকাল সোমবারের (৮ জুন) মধ্যে এটি পুরোপুরি সচল করা সম্ভব হবে এবং তা হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ আবার স্বাভাবিক নিয়মে ফিরবে।

Visited 13 times, 1 visit(s) today