জুলাই মামলা: ঢাকা থেকে ১২৭ কি.মি দূরে থেকেও ৪০ গুলি খাওয়ার দাবি, হয়রানির শিকার শত শত মানুষ

জুলাই মামলা: ঢাকা থেকে ১২৭ কি.মি দূরে থেকেও ৪০ গুলি খাওয়ার দাবি, হয়রানির শিকার শত শত মানুষ
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনের ডামাডোলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এক কিশোর পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন — এমন দাবিতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন মো. মামুন নামে এক ব্যক্তি।

কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর সত্য। কথিত ভুক্তভোগী সেই কিশোর রিমন ঘটনার দিন ঢাকায় ছিলেনই না — তিনি ছিলেন ঘটনাস্থল থেকে ১২৭ কিলোমিটার দূরে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়।

শুধু তাই নয়, রিমন নিজেই গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন যে তিনি কোনো ঘটনায় আহত হননি এবং এই মামলার বিষয়ে তার সঙ্গে কেউ কোনো আলোচনাও করেননি।

এজাহারে যা দাবি করা হয়েছিল

মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বাদীর ছেলে রিমন যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার থেকে বাসায় ফেরার পথে যাত্রাবাড়ী মাতৃসদন হাসপাতালের পাশের রাস্তায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত একদল লোক তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এজাহার অনুযায়ী, ডেমরা থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) সুব্রত কুমার পোদ্দার শটগান দিয়ে গুলি করলে রিমনের পেটের বাম পাশে গুলি লেগে বেরিয়ে যায়।

এতেই শেষ নয়। মহানগর পুলিশের ওয়ারী বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার ইকবাল হোসেন, অতিরিক্ত উপকমিশনার নুরুল আমিন, যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, একই থানার এসআই সেলিম সরকার এবং ডিবির এসআই সিকদার মুহিতুল আলম শটগান দিয়ে গুলি চালালে রিমনের পিঠে ১০ থেকে ১২ স্থানে জখম হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

এজাহারে আরও দাবি করা হয়, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি এ কে এম শাহ আলম রামদা দিয়ে রিমনের ডান পায়ের উরুতে কোপ দেন এবং ডেমরা থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মো. পরশ রড দিয়ে হাঁটুতে আঘাত করেন।

এ ছাড়া বিভিন্ন ঠিকানার আরও ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, তারা শটগান দিয়ে গুলি ছুড়লে রিমনের দুই হাঁটুর নিচে সর্বমোট ৩৫ থেকে ৪০টি গুলি লাগে।

রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়লে অন্যরা রড, চাইনিজ কুড়াল, লাঠি ও চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ও কুপিয়ে তাকে গুরুতর জখম করেন বলে দাবি করা হয়।

এই হামলাকারীদের তালিকায় এজাহারে যুক্ত করা হয় সাবেক সংসদ সদস্য সাঈদ খোকন, কাজী ফিরোজ রশীদ, শ ম রেজাউল করিম ও শেখ ফজলে নূর তাপস এবং যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের মতো আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নাম। মোট নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ৬৯ জন।

সত্য যা বলছে

কিন্তু অনুসন্ধানে পুরো বিষয়টি উল্টে যায়। কথিত ভুক্তভোগী রিমনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে গণমাধ্যম জানতে পারে, তিনি মামলায় যে ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কে কিছুই জানেন না।

মামলায় তার বয়স ২০ বছর বলা হলেও রিমন নিজে জানান, তার বর্তমান বয়স ১৭। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় একটি গাড়ির ওয়ার্কশপে কাজ করেন তিনি।

রিমন গণমাধ্যমকে বলেন, “২০২৪ সালের আগস্টে আমি নিজের এলাকাতেই (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ছিলাম, ঢাকায় যাইনি। মামলায় যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে সে ব্যাপারে কিছুই জানি না। আমি কোনো ঘটনায় আহত হইনি। বাবা কেন এই মামলা করেছেন সেটি তিনিই ভালো বলতে পারবেন। এ বিষয়ে আমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি।”

রিমন আরও জানান, তার বাবা ২০০৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে চলে যান এবং তখন থেকে পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। পরে দেশে ফিরে আরেকটি বিয়ে করে আলাদা থাকেন তিনি। সন্তানদের খোঁজও নেন না। রিমনরাও বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন না।

পিবিআই তদন্তেও মেলেনি সত্যতা

আদালতে দায়ের হওয়া এই সিআর মামলার তদন্তভার পড়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বিশেষায়িত তদন্ত ও অভিযান শাখার অনুসন্ধানেও এজাহারের বক্তব্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

পিবিআইর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈছা আন্দোলনের সময় রিমন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার জয়নগর বাজার এলাকায় একটি এসএস পাইপের দোকানে কাজ করতেন। আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকায় ছিলেনই না।

তদন্তকালে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের অবস্থানও কসবায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনার আগে ও পরেও রিমনের ঢাকায় অবস্থানের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পিবিআইর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানজিনা আক্তার বলেন, “সাক্ষ্য-প্রমাণে এই সিআর পিটিশনের সত্যতা না পাওয়ায় আমরা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি। আদালত থেকে এখনও কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।”

নিরীহ মানুষের হয়রানি ও অর্থ আদায়

মিথ্যা অভিযোগে করা এই মামলায় নাম উল্লেখ করা ৬৯ আসামির অনেকেই চরম হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর বাইরে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবেও বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা তুলে নেওয়া বা আসামির তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে অনেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়েরও অভিযোগ উঠেছে।

মামলার ৪৩ নম্বর আসামি ব্যবসায়ী সাদেক হোসেন বিজুর বাবা, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারেক বলেন, “মামলা হওয়ার কিছুদিন পর ৮ থেকে ১০ জন বাসায় এসে মব সন্ত্রাস চালায়। বিজুকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেওয়া হবে বলে ভয় দেখায়। পরে একজন বলে, কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে বিষয়টি মিটমাট করে ফেলেন।”

তিনি জানান, নিজে টাকা না দিলেও অন্যদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা তিনি শুনেছেন।

মোতালিব প্লাজার ব্যবসায়ী ও মামলার আরেক আসামি দীন ইসলাম দীপু বলেন, “কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে আসামি করা হয়েছে। বাদীকে আমি চিনি না, তিনিও আমাকে চেনেন না। কেউ তাকে দিয়ে এ কাজ করিয়েছেন। যোগাযোগ করার পর আমার নাম বাদ দিয়েছে। সেজন্য কিছু টাকা খরচ করতে হয়েছে।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হয়রানি এড়াতে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন এমন অন্তত আটজনের তথ্য মিলেছে। তবে পুনরায় হয়রানির আশঙ্কায় তারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।

তাদের ভাষ্য, “টাকা দিয়ে হলেও ঝামেলা থেকে বেঁচেছেন। নতুন করে আর ঝামেলা বাড়াতে চাই না। এলাকায় শান্তিতে বসবাস করা যাবে না তখন।”

দায় এড়াচ্ছেন সবাই

মামলার বাদী মো. মামুন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ৬৪ নম্বর ওয়ার্ড (পূর্ব) বিএনপির নেতা। মিথ্যা মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মামলা তো আমি করি নাই। আমারে দিয়া করাইছে আরেকজন। আসামি কাউরেই আমি চিনি না। যে মামলা করাইছে আসামিও সেই দিয়া দিছে।”

তবে কারও কাছ থেকে কোনো টাকা নেননি বলে দাবি করেন তিনি। তথ্য-প্রমাণের কথা জানানো হলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।

প্রথম কথোপকথনে মামুন দাবি করেন, ৬৪ নম্বর ওয়ার্ড (পূর্ব) বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল ভূঁইয়া তুহিন তাকে দিয়ে মামলা করিয়েছেন। তবে কিছুক্ষণ পরেই তিনি আবার ফোন করে সে কথা প্রত্যাহার করে নেন। কে মামলা করিয়েছেন — এই প্রশ্নের জবাব আর দেননি তিনি।

অন্যদিকে বিএনপি নেতা তুহিন দাবি করেন, রিমনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা মিথ্যা নয়।

তিনি বলেন, রিমন আওয়ামী লীগের ভয়ে এখন সত্য প্রকাশ করছেন না। ছেলে আহত হওয়ার ঘটনায় মামুন নিজে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করায় তুহিন মামলা দায়েরের পরামর্শ দেন এবং সে জন্য অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক ভূঁইয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।

কিন্তু আইনজীবী যাদের আসামি করেছেন, তাদের তিনি চেনেন না বলে দাবি করেন তুহিন। টাকা নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।

তবে মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া তুহিনের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, “বাদী যদি এসে অভিযোগ করেন তার ছেলে আহত, তাহলে আইনজীবীর কী দোষ? আমি তো আর তদন্ত করতে যাইনি।”

পাশাপাশি তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন — “ইসমাইল ভূঁইয়া তুহিনের সঙ্গেই বাদী এসেছিলেন। তারাই আসামিদের নাম-ঠিকানা দিয়েছেন। তুহিন যদি আসামিদের না চেনেন, তাহলে এফিডেভিট করে অনেক আসামির নাম বাদ দিলেন কীভাবে?”

মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আসামিদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, মামুন মূলত তুহিনের সঙ্গেই চলাফেরা করেন এবং পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা তোলার কাজ তুহিনের লোকজনই করেছেন।

তাদের দাবি, গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এবং দলের কমিটি গঠনের আগে গা বাঁচাতেই এই অস্বীকৃতি। তারা আরও অভিযোগ করেন, এই মামলা ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি ভুয়া মামলা বাণিজ্যের মাধ্যমে নিরীহ মানুষের কাছ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

Visited 9 times, 1 visit(s) today