চট্টগ্রামে অন্তঃসত্ত্বা কর্মী বরখাস্ত: ৭ বছরের বেতনসহ চাকরি ফেরতের নির্দেশ শ্রম আদালতের

চট্টগ্রামে অন্তঃসত্ত্বা কর্মী বরখাস্ত: ৭ বছরের বেতনসহ চাকরি ফেরতের নির্দেশ শ্রম আদালতের
শেয়ার করুন

❐ সংবাদ প্রতিবেদন


অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে চাকরি হারানো এক নার্স দীর্ঘ ৭ বছরের অদম্য আইনি লড়াই শেষে অবশেষে ন্যায়বিচার পেলেন।

চট্টগ্রামের দ্বিতীয় শ্রম আদালত টি কে ফুট ওয়্যার লিমিটেডের নার্স ফিরোজা আক্তারের পক্ষে রায় ঘোষণা করেছেন। আদালত তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করার পাশাপাশি ২০১৯ সাল থেকে বকেয়া বেতন এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফিরোজা আক্তার ২০১৭ সালের ১০ই অক্টোবর চট্টগ্রামের টি কে ফুট ওয়্যার লিমিটেডে নার্স পদে যোগদান করেন। দুই বছর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৯ সালে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন। এরপরেই বদলে যায় তার কর্মজীবনের চিত্র।

অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পরপরই প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উত্থাপন করে এবং প্রথম দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠায়। ফিরোজা যথাযথভাবে লিখিত জবাব দিলেও কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ না করে দ্বিতীয় দফায় আবারও নোটিশ জারি করে। একপর্যায়ে কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তঃসত্ত্বা হওয়াই ছিল তার ‘অপরাধ’ — আর অসদাচরণের অভিযোগ ছিল কেবল একটি অজুহাত।

বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ফিরোজা। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর আইনি সহায়তায় তিনি চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করেন।

এই দীর্ঘ লড়াইয়ে তার পাশে ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কোঅর্ডিনেটর ফজলুল কবির মিন্টু। তিনি ফিরোজাকে আইনি পরামর্শ, কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব প্রস্তুতসহ নানামুখী সহায়তা প্রদান করেন।

দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় শ্রম আদালতের বিচারক বেগম জেবুননেছা ফিরোজা আক্তারের পক্ষে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে বিচারক নির্দেশ দেন — ফিরোজার চাকরির ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখে তাকে পুনর্বহাল করতে হবে, ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সকল বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে এবং প্রাপ্য মাতৃত্বকালীন সুবিধাও দিতে হবে।

এই মামলা শ্রম বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার প্রশ্নও সামনে এনেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রম আদালতে মামলা নিষ্পত্তির নির্ধারিত সময়সীমা মাত্র ৬০ দিন, যা বিশেষ পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ আরও ৯০ দিন বাড়ানো যায়। অথচ ফিরোজার মামলার নিষ্পত্তি হতে লেগেছে প্রায় সাত বছর — যা আইনি সময়সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি এবং শ্রমজীবী মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে বড় বাধার ইঙ্গিত দেয়।

রায়ের পর বিলসের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কোঅর্ডিনেটর ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, “আদালত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা আশা করছি, প্রতিষ্ঠানটি আদালতের রায় মেনে ফিরোজা আক্তারের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেবে।”

ফিরোজা আক্তারের এই জয় কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত বিজয় নয় — এটি বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে গর্ভকালীন বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির। তার সংগ্রাম ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতিতে পড়া হাজারো শ্রমজীবী নারীর অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

Visited 4 times, 1 visit(s) today