জ্বালানি আমদানি কমায় তীব্র ঝুঁকিতে অর্থনীতি, রপ্তানি খাতে বহুমুখী চাপ

জ্বালানি আমদানি কমায় তীব্র ঝুঁকিতে অর্থনীতি, রপ্তানি খাতে বহুমুখী চাপ
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত থেকে নয় মাসে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও আর্থিক খাতে মিশ্র প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমদানি এলসি খোলা ও নিষ্পত্তিতে খাতভিত্তিক ভিন্নতা দেখা গেলেও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে প্রবৃদ্ধি শিল্পায়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে জ্বালানি ও কিছু রপ্তানিমুখী খাতে চাপ বিদ্যমান। এর বিপরীতে রেমিট্যান্স প্রবাহে শক্তিশালী ইতিবাচক ধারা অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি জুগিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে আমদানি এলসি খোলার হার বেড়েছে ২.৪১ শতাংশ। তবে একই সময়ে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১.২১ শতাংশ।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খোলা বেড়েছে ১৪.৫৫ শতাংশ, যদিও নিষ্পত্তি কমেছে ১২.৭৫ শতাংশ। এ প্রবণতা বিনিয়োগ কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতির ইঙ্গিত দেয়। গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতে যন্ত্রপাতি আমদানি কমলেও অন্যান্য শিল্প খাতে তা বেড়েছে।

অন্যদিকে বিবিধ শিল্পের যন্ত্রপাতি খাতে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক শক্তিশালী। এ খাতে এলসি খোলা বেড়েছে ২০.৮৪ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি বেড়েছে ১৭.৪৫ শতাংশ। মোটরযান, ইলেকট্রনিক্স ও লৌহজাত পণ্য আমদানির উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্মাণ ও ভোক্তা খাতের সক্রিয়তা নির্দেশ করে।

তবে জ্বালানি খাতে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। পেট্রোলিয়াম ও জ্বালানি পণ্য আমদানিতে এলসি খোলা কমেছে ৫.৭৩ শতাংশ এবং নিষ্পত্তি কমেছে ৮.৭৫ শতাংশ। অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি হ্রাসের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কিংবা চাহিদা সংকোচন প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, আমদানি এলসিতে প্রবৃদ্ধি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা গতি ফেরার ইঙ্গিত দিলেও জ্বালানি আমদানি কমে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, জ্বালানি আমদানি হ্রাসের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ নীতি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব শিল্প উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির ওপর পড়তে পারে।

তারা বলছেন, সামগ্রিকভাবে রেমিট্যান্স ও রাজস্ব আয়ের ইতিবাচক ধারা অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করলেও রপ্তানি ও বেসরকারি বিনিয়োগে চাপ এবং জ্বালানি আমদানির নিম্নমুখী প্রবণতা অর্থনীতিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তবে মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা এবং বৈদেশিক খাতে উন্নতির কিছু ইঙ্গিত ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদ জাগাচ্ছে।

বাহ্যিক খাতের চিত্রেও চাপের ইঙ্গিত রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে পণ্য রপ্তানি কমেছে ৩.৭৮ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৫২ শতাংশ। তবে একই সময়ে পণ্য আমদানি বেড়েছে ৪.৮৮ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা কম প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।

রপ্তানিতে চাপ থাকলেও রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। জুলাই-মার্চ সময়ে প্রবাসী আয় ২০.৩০ শতাংশ বেড়ে ২৬.২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর প্রভাবে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে দাঁড়িয়েছে ১ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১.৪৭ বিলিয়ন ডলার।

পাশাপাশি আর্থিক হিসাবে ৪.০৮ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত রেকর্ড হয়েছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে ছিল মাত্র ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার।

তবে বৈদেশিক সহায়তা প্রবাহে নেতিবাচক ধারা দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে মোট বৈদেশিক সাহায্য কমেছে ২৬.১৫ শতাংশ এবং নিট বৈদেশিক সাহায্য কমেছে ৫৫.৫১ শতাংশ।

মুদ্রা ও ঋণ পরিস্থিতিতেও বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রড মানি (এম২) প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১০.৫২ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭.৫৫ শতাংশ। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১.৩০ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ২৯.৬১ শতাংশে পৌঁছালেও বেসরকারি খাতে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬.০৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে নিট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ৩৪২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৮৮ হাজার ৩০৯ কোটি ১০ লাখ এবং ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ৪ হাজার ৩৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সামগ্রিকভাবে আমদানি এলসি খোলায় বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি, তবে মূলধনি যন্ত্রপাতি কিছুটা বেড়েছে। ডলারের কোনো সংকট নেই এবং আমদানিতেও কড়াকড়ি নেই।

Visited 8 times, 1 visit(s) today