❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামী ১০ই মে থেকে শুরু হতে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবচেয়ে বড় বার্ষিক আয়োজন ‘পুলিশ সপ্তাহ’। এবারের আয়োজনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আনা হয়েছে একাধিক নতুন বিধিনিষেধ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো—ধাতব কলম বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
পুলিশ কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় আসা ‘পেনগান’ নামের ছদ্মবেশী অস্ত্রের শঙ্কা।
আয়োজকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুলিশ সপ্তাহের প্রধান অনুষ্ঠানগুলোতে ছুরি, চাকু ও আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি কোনো ধরনের ধাতুর তৈরি কলম নিয়েও প্রবেশ করা যাবে না।
এ নিষেধাজ্ঞা পুলিশ সদস্য, সাংবাদিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিসহ সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ইস্যুতে আলোচনার সময় পেনগানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এরপরই আমন্ত্রণপত্রে নিষিদ্ধ সামগ্রীর তালিকায় ধাতব কলম যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কারণ, দেখতে সাধারণ কলমের মতো হওয়ায় এটি তল্লাশির সময় সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে এক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখছে রাষ্ট্রীয় বাহিনীটি।
বাংলাদেশে পেনগানের অস্তিত্ব প্রথম সামনে আসে খুলনায়।
পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, দেখে মনে হবে পিতলের তৈরি সৌখিন একটি কলম। অধিকাংশ সাধারণ কলমের মতোই দৈর্ঘ্য সাড়ে ৫ ইঞ্চি। বহন করা যাবে খুব সহজে। শার্ট-প্যান্ট কিংবা পাঞ্জাবির পকেটে রাখা যাবে অনায়াসে। রাখা যাবে ডায়েরি-প্যাডের ভাঁজেও। কেউ সন্দেহও করতে পারবে না। কিন্তু কলমসদৃশ বস্তুটির ভেতরে কালি নেই, রয়েছে সাক্ষাৎ মৃত্যু পরোয়ানা! কারণ কলমের মতো দেখতে হলেও এটি কলম নয়, ভয়ংকর এক মারণাস্ত্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেনগান মূলত একটি সক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র, যা পিতলের ক্যাপ ও স্টিলের বডি দিয়ে তৈরি। এর ভেতরে থাকে ব্যারেল ও ফায়ারিং পিন, যা স্প্রিং মেকানিজমের মাধ্যমে পিস্তলের মতো কাজ করে। এতে সাধারণত ৭.৬৫ ক্যালিবারের বুলেট ব্যবহার করা হয় এবং একবারে একটি গুলি ছোড়া যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এটি প্রায় নিঃশব্দে গুলি ছুড়তে সক্ষম, যা একে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
এর ব্যবহার পদ্ধতিও অত্যন্ত সহজ। মাঝখান থেকে খুলে বুলেট লোড করার পর স্প্রিংযুক্ত লিভার টানলেই ফায়ারিং পিন বুলেটে আঘাত করে এবং গুলি বেরিয়ে আসে। ফলে এটি সহজে বহনযোগ্য, দ্রুত ব্যবহারযোগ্য এবং অত্যন্ত গোপনীয় একটি অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি এই পেনগান নতুন করে আলোচনায় আসে পুরান ঢাকার নয়াবাজারে ঘটে যাওয়া এক গুলির ঘটনায়।
গত ৩রা এপ্রিল যুবদল নেতা রাসেল গুলিবিদ্ধ হন এবং পরবর্তীতে ঘটনাস্থল থেকে একটি পেনগান উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
পুলিশ সূত্রগুলো বলছে, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু আনুষ্ঠানিক সতর্কতা নয়; বরং নতুন ধরনের ছদ্মবেশী অস্ত্রের ঝুঁকি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। কারণ পেনগান এতটাই নিখুঁতভাবে ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে যে প্রচলিত নিরাপত্তা তল্লাশিতেও এটি সহজে ধরা পড়ে না।
পুলিশ কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, দেখতে সাধারণ কলমের মতো হলেও এসব অস্ত্রে .২২ বা .২৫ ক্যালিবারের গুলিও ব্যবহার করা সম্ভব। যদিও এটি সিঙ্গেল-শট অস্ত্র, তবুও এর বহনযোগ্যতা ও দ্রুত ব্যবহারের সুবিধার কারণে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—এ ধরনের অস্ত্রে সাধারণত কোনো সিরিয়াল নম্বর বা নির্মাতার চিহ্ন থাকে না, ফলে এর উৎস শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন গোয়েন্দা বৈঠকেও পেনগানের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়, চোরাচালানের মাধ্যমে এ ধরনের অস্ত্র দেশে প্রবেশ করছে এবং ধীরে ধীরে অপরাধীদের হাতে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, জনাকীর্ণ এলাকা, রাজনৈতিক সমাবেশ বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে টার্গেট কিলিংয়ের মতো ঘটনায় এগুলো ব্যবহার হতে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে পুলিশ সপ্তাহে ধাতব কলম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে পুলিশ সপ্তাহ উদযাপন কমিটির সদস্য এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ‘পেনগান’ ব্যবহার করে হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যতম প্রধান অনুষ্ঠান ‘পুলিশ সপ্তাহ’-এর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধাতব কলম বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ধরনের ছদ্মবেশী অস্ত্রের ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে আরও সতর্ক ও কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তারই প্রতিফলন এবারের পুলিশ সপ্তাহের এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত।
